জাতীয়

রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধে আইটিসিএলের সেবা বন্ধ, বিপাকে লাখ লাখ কার্ডধারী

রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধ

ঢাকা, ০৭ অক্টোবর-নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত একটি রুশ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারণে তৈরি সাইবার বিভ্রাটে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো মারাত্মকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। রবিবার রাত থেকে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ রয়েছে। দেশের ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রাথমিক পেমেন্ট প্রসেসিং ও গেটওয়ে অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইনফরমেশন টেকনোলজিস কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আইটিসিএল) সঙ্গে রুশ প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের সফটওয়্যার মাইগ্রেশন নিয়ে বিরোধ থেকেই এই সংকটের শুরু। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং-কার্ড লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশই কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী আইটিসিএলের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

আইটিসিএল জানায়, ব্রাসেলসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের তৈরি এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ে৪’ দিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্ম প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে—এমন খবর জানতে পেরে রুশ প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভারে একটি ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়। এই স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইটিসিএলের সার্ভারগুলো রিস্টার্ট করে দেয়। এতে রাউটিং টেবিলগুলো মুছে যায় এবং পুরো নেটওয়ার্কে ডেটা প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। গত আগস্টে আইটিসিএল ১২ থেকে ১৮ মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্ম ধাপে ধাপে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় কম্পাস প্লাস কারিগরি সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মাইগ্রেশন ফি দাবি করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত আগাম পেমেন্ট গ্যারান্টিও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।

পরিস্থিতি নিয়ে আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী সাইফুদ্দিন মুনির গণমাধ্যমকে বলেন, সমস্যাটি চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সব অংশীদার ব্যাংককে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর আবারও সেবা চালু করা যাবে বলে তারা আশা করছেন।

এদিকে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ পেমেন্ট সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও আইটিসিএলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এটি স্পষ্টভাবে একটি কারিগরি সমস্যা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, হঠাৎ সেবা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জনগণকে পর্যাপ্ত সময় আগে জানানো বাধ্যতামূলক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ প্রথমে অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ করে আমাদের জানায়, তাদের জরুরি ভিত্তিতে সেবাটি অফলাইনে নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, তারা দাবি করেছে, জরুরি পরিস্থিতি তাদের এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করে দেওয়া নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আইটিসিএলের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে হঠাৎ করে সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও এটিএম বুথে চরম বিপাকে পড়েন। তারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ লেনদেন করা বা অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স চেক করতেও ব্যর্থ হন।

হঠাৎ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সদস্য ব্যাংকগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ায় তারা তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, আইটিসিএল রবিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি তাদের জানায়, ঠিক যেদিন তারা সেবাটি বন্ধ করে দেয়। গ্রাহকদের জানানোর জন্য তাদের একদিন সময়ও দেওয়া হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা আরও বলেছে, এটি ছিল সম্পূর্ণ অপেশাদার একটি পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপের কারণে সব সদস্য ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হয়েছে।

এস এম/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language