২১ লাখ নতুন দরিদ্র, রাজস্ব খরার খড়গে কর্মসংস্থান শূন্য: বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বাংলাদেশে গভীর মন্দার সংকেত

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর – দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন স্থবিরতা, রাজস্ব সংকট ও কর্মসংস্থানের খরা! রাজকোষে কর আদায়ের করুণ অবস্থার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি এবং অব্যাহত জ্বালানি সংকটের কারণে দেশটির সার্বিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক চিত্র—২০২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব সংগ্রহ জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বমানদণ্ডে সবচেয়ে তলানিতে থাকা হারের একটি!
সংস্থাটির এই কঠোর ও বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন জানান দিচ্ছে যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাঠামোগত সংস্কার এড়িয়ে চলার চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে।
মূল চিত্র: রাজস্ব খরা, স্তব্ধ কর্মসংস্থান ও ২১ লাখ মানুষের নতুন দারিদ্র্য
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্পে মন্দা ও বিনিয়োগে অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়:
২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের অতলে: ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে গেছেন।
কর্মসংস্থান বন্ধ ও নারীদের চাকরি হারানো: নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাকা কার্যত স্তব্ধ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় খাতেই ব্যাপক সংখ্যায় নারীরা তাদের চাকরি খুইয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের লাগামহীন ধ্বংস: ব্যাংক খাতে খেলাপির পরিমাণ আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০.৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে এসে একলাফে রেকর্ড ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা: ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪ শতাংশে থমকে থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় সংস্কার দৃশ্যমান হলে ২০২৮ অর্থবছরে তা কিছুটা উদ্ধার পেয়ে ৩.৯ শতাংশে যেতে পারে।
সংকট উত্তরণের ফর্মুলা: ৩ প্রধান খাতে জরুরি সংস্কারের তাগিদ
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে স্পষ্ট করে বলেছেন, গভীর অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আর বিলম্ব না করে ৩টি স্পর্শকাতর খাতে দৃশ্যমান ও সাহসী সংস্কার চালাতে হবে:
১. ব্যাংকিং খাতের স্থায়িত্ব: খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য থামানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আইনি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
২. অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি: কর ফাঁকি বন্ধ ও কর কাঠামোর আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করা।
৩. জ্বালানি নিরাপত্তা সুগম করা: শিল্প কারখানার চাকা সচল রাখা ও ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনার উপায়
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যে, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সুবিধার সিংহভাগই প্রকৃত দুস্থদের কাছে পৌঁছায় না। বর্তমানে দেশের চরম দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক অংশই যেকোনো ধরনের সরকারি সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ:
সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ দ্রুত বাস্তবায়ন ও সারাদেশে সম্প্রসারণ করা।
একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও বিদ্যমান নগদ সহায়তাকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর সাথে আরও সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত করা।
কেবল সঠিক উপকারভোগী বাছাই ও সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব।
আশার আলো কেবল রেমিট্যান্সের শক্তিতে
চলমান সর্বাত্মক সংকটের ভেতরেও কেবল একটি খাতই কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে—তা হলো বহিঃখাত। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভাই-বোনদের পাঠানো জোরালো রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬







