জাতীয়

ডিজিটাল যুগে অপতথ্যের ছড়াছড়ি: আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসে স্বাধীন কমিশন গঠন ও আইন সংস্কারের দাবি

ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর – প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা আনয়ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি বজায় রাখা এবং নাগরিকের সত্য ও তথ্য জানার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজ ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষ্যে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’।

সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবের ভিড়ে সত্যের সন্ধান: কেন তথ্য অধিকার এখন বেশি জরুরি?

ইন্টারনেটের এই গতিময় যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ভুল তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের অবাধ বিস্তার। যাচাই ছাড়া মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়া এসব অপতথ্য ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে ভুয়া তথ্যের বিষবাষ্প রুখে দিতে প্রধান হাতিয়ার হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক ‘তথ্য অধিকার’। সরকারি সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প ও জনসেবা সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হলে খুব সহজেই যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। এতে যেমন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, তেমনি গুজবের দাপটও অনেকাংশে কমে আসবে।

“দলীয় পরিচয়ের বাইরে স্বাধীন কমিশন গঠন জরুরি”

আইন বিদ্যমান থাকলেও এর মাঠপর্যায়ের প্রয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তথ্য অধিকার ফোরামের কোর গ্রুপের সদস্য এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, তথ্য কমিশন সক্রিয় না থাকায় বর্তমানে নাগরিকদের জমা পড়া অসংখ্য আপিলের সমাধান মিলছে না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “সাধারণ নাগরিককে ক্ষমতায়িত করতে তথ্য অধিকার আইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রকাশযোগ্য তথ্য পাওয়ার পূর্ণ অধিকার নাগরিকের রয়েছে। তবে এটি শতভাগ নিশ্চিত করতে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তথ্য কমিশন গঠন এবং সেখানে যোগ্য ও নির্দলীয় মানুষদের নিয়োগ দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনটির যুগোপযোগী সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিশীলন জরুরি।”

কর্মকর্তাদের ‘দয়া’ নয়, নাগরিকের অধিকার: প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ

আইনটির বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতাকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম মনে করেন, শুধু কাগজ-কলমে আইন ও বিধিমালা বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখলেই সুফল মিলবে না।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের মাইন্ডসেট বদলাতে হবে। তথ্য প্রদানকে কোনো ‘দয়া’ বা ‘অনুগৃহ’ মনে না করে নাগরিকের অধিকার হিসেবে গণ্য করার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তথ্য প্রদানে অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা অনীহা দেখালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

অপতথ্য রোধে বিশেষজ্ঞদের মূল সুপারিশসমূহ:

স্বাধীন ও শক্তিশালী তথ্য কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে দ্রুত তথ্য কমিশন গঠন করা।

সহজ ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা: সরকারি দপ্তরগুলোতে অনলাইনের মাধ্যমে সহজে ও দ্রুত তথ্য পাওয়ার পথ সুগম করা।

ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি: নাগরিক পর্যায় ও সংবাদমাধ্যমে ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

ডিজিটাল দুনিয়ার গুজবের ফাঁদ থেকে মুক্ত থেকে একটি সচেতন সমাজ গড়তে সঠিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করার বিকল্প নেই।

এনএন/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language