উত্তর আমেরিকা

গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির নতুন অধ্যায়: ট্রাম্পের দাবি বনাম ডেনমার্কের বাস্তব কৌশল

ওয়াশিংটন, ১৯ সেপ্টেম্বর – আর্কটিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় ঘুরি দিল গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে মার্কিন আগ্রহ। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এক নিরাপত্তা সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এ চুক্তির অধীনে গ্রিনল্যান্ডের স্থায়ী নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওয়াশিংটনের হাতে এবং প্রতিপক্ষ যেকোনো দেশকে সামরিক উপস্থিতি থেকে দূরে রাখা যাবে। তবে ওয়াশিংটনের এই দাবির বিপরীতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকারের সুর খানিকটা ভিন্ন। তারা বিষয়টিকে সার্বিক নিরাপত্তা চুক্তি হিসেবে দেখলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই সর্বাধিকার দিচ্ছেন।

ঘটনাক্রম ও ট্রাম্পের মূল দাবি:

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ট্রুথ সোশ্যালের বার্তায় ট্রাম্প জানান, তার নির্দেশেই এই কূটনৈতিক আলোচনা পরিচালিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার স্বার্থে যা প্রয়োজন, তা করার পূর্ণ ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে।

প্রতিপক্ষকে ব্লক করা: যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত অনুমতি ছাড়া চীন বা রাশিয়ার মতো কোনো প্রতিপক্ষ দেশ গ্রিনল্যান্ডে কোনো সেনাবেষ্টনী, সামরিক ঘাঁটি বা সংবেদনশীল খাতে বড় অর্থায়ন করতে পারবে না।

সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি: গ্রিনল্যান্ডের উপযুক্ত একাধিক স্থানে মার্কিন বড় ধরণের সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে বলে দাবি করেন তিনি।

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান: চুক্তি বনাম সার্বভৌমত্ব

ট্রাম্পের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের দাবির বিপরীতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের যৌথ বিবৃতির সুর কিছুটা সতর্ক ও কৌশলী।

জাতিসংঘ অধিবেশনে চুক্তি সই: আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) অধিবেশন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে।

সংসদের অনুমোদন শর্ত: চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে ডেনমার্ক এবং স্থানীয় গ্রিনল্যান্ড—উভয় পার্লামেন্টেরই ছাড়পত্র বা অনুমোদন লাগবে।

সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা: ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নতুন চুক্তিতে ডেনমার্কের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের মানুষের নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও স্বীকৃত।

নিরাপত্তা জোরদারের আশা: গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, যৌথ সমঝোতার ফলে আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব আরও পোক্ত হবে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:

উত্তর মেরু অঞ্চলে বরফ গলতে শুরু করায় সেখানকার খনিজ সম্পদ এবং নতুন নৌ-পথের ওপর চোখ পড়েছে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য জোরালো করতে আগ্রহী। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক অঞ্চলে (সাবেক থুলে) মার্কিন বিমানঘাঁটি ও স্পেস ফোর্স ইতিমধ্যেই সক্রিয়। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ভূ-খণ্ডগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, সেখানে ইউরোপীয় মিত্ররা এটিকে নেটো (NATO) কাঠামোর আওতায় আর্কটিক অঞ্চলের যৌথ নিরাপত্তার কৌশল হিসেবে দেখতে চাইছে। তবে মূল চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং পার্লামেন্টের সবুজ সংকেত মেলে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে বরফাবৃত দেশটির ভবিষ্যত সামরিক দৃশ্যপট।

এনএন/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language