ইরানের নতিস্বীকার নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল? কেন হঠাৎ স্তব্ধ মার্কিন যুদ্ধবিমান!

তেহরান, ২৮ জুলাই –মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে চলা টানা ১৩ রাতের বোমারু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন হঠাৎ করেই স্তব্ধ। হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা যখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছিল, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভিযান স্থগিতের ঘোষণা শোরগোল ফেলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে। তবে এই যুদ্ধবিরতির পেছনের কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি—ইরান নিজেই যুদ্ধ থামাতে আকুতি জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে শান্তি আলোচনায় বসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু অন্যদিকে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের বয়ান একেবারেই ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সরকারি বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ সফররত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বেশ আত্মবিশ্বাসের সুরেই পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, তেহরান ব্যাকচ্যানেলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ট্রাম্প বলেন, “তারা খুব ভদ্রভাবে আমাদের বলেছে—‘দয়া করে অভিযান থামান, আসুন সাক্ষাৎ করি’। আমরা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারি, তবে আমাদের আবার সেই পুরোনো কঠোর পথেই ফিরে যেতে হবে।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর স্পষ্ট হয়ে যায়, কেন টানা ১৩ দিন ধরে চলা মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) হামলা গত ২৫ জুলাই শনিবার থেকে হঠাৎ থমকে গেল।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল চলতি মাসের প্রথম দিকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজে ড্রোন হামলা চালায় ইরানের অভিজাত সামরিক শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। অভিযোগ ওঠে, তেহরান ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র চরম লঙ্ঘন করেছে।
এর জবাবেই মার্কিন সেন্টকমের বোমারু বিমানগুলো ইরানি সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলা চালানো শুরু করে। বসে থাকেনি ইরানও; মধ্যপ্রাচ্যে থাকা একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে দিনরাত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া শুরু করে আইআরজিসি।
১৩ দিনের এই মুখোমুখি হামলায় যখন পুরো অঞ্চল এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখনই ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের বার্তা দিলেন।
ট্রাম্প যেটিকে ইরানের ‘নতিস্বীকার’ এবং ‘শান্তি আলোচনার আবদার’ হিসেবে তুলে ধরছেন, মাঠপর্যায়ের চিত্র কিন্তু কিছুটা ভিন্ন কথা বলছে।
রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, তেহরানের এক সরকারি কর্মকর্তা ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছেন, ইরান শুরু থেকেই ‘হামলার বদলে হামলা’ নীতিতে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ থামিয়েছে বলেই তারা পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে। ইরান কেবল এই বার্তাই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছে, কোনো নতিস্বীকারের প্রস্তাব নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান: অথচ ঠিক দু’দিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে কোনো শান্তি সংলাপ বা আলোচনার দূরতম পরিকল্পনাও তেহরানের নেই।
ইরান কি সত্যিই ট্রাম্পের সামরিক চাপে পড়ে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে না জড়াতে কৌশলী অবস্থান নিচ্ছে—তা নিয়েই এখন বিশ্লেষকদের জোর চর্চা।
যদি এই সাময়িক বিরতি শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে রূপ না নেয়, তবে হরমুজ প্রণালি ও গোটা মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখে পড়বে—যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে।
এনএন/ ২৮ জুলাই ২০২৬









