চীন ও উত্তর কোরিয়ার ছয় দশকের কৌশলগত বন্ধুত্ব ও পরিবর্তিত ভূরাজনীতি

বেইজিং, ১১ জুলাই – চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ককে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ঠোঁট ও দাঁতের মতো ঘনিষ্ঠ বলে অভিহিত করে আসছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতারা প্রায়ই এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে রক্তে সিলমোহর দেওয়া সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শগত মিলের চেয়ে এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো কৌশলগত প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা করা।
১৯৬১ সালের ১১ জুলাই তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল সুং বেইজিংয়ে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সেই চুক্তির কার্যকারিতা আজও অটুট রয়েছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, দুই দেশের মধ্যে যেকোনও একটি রাষ্ট্র সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অপর দেশটি প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা প্রদান করবে। এটি বর্তমানে চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রতিরক্ষা জোট। সম্প্রতি এই চুক্তির ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থে সং তিন দিনের সফরে বেইজিং ভ্রমণ করেন।
এই সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই দেশ তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধের সময় থেকে এই সম্পর্কের সূচনা ঘটে। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে কয়েক লাখ সেনা পাঠিয়েছিল বেইজিং।
যুদ্ধের সেই যৌথ স্মৃতি আজও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়াকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার চেয়ে দেশটিকে স্থিতিশীল রাখাই বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য। বেইজিং চায় না উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক, কারণ এতে ব্যাপক শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি সীমান্তে মার্কিনপন্থী একীভূত কোরিয়া গঠনের আশঙ্কা তৈরি হবে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি বেইজিংয়ের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সহায়ক হলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা এবং নিয়মিত যৌথ মহড়া চীন ও উত্তর কোরিয়াকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছে। সার্বিকভাবে এই জোটের মূল ভিত্তি আবেগ বা আদর্শ নয়, বরং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এস এম/ ১১ জুলাই ২০২৬









