পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গে পাশ হলো বিতর্কিত ‘গুন্ডা দমন বিল’, তীব্র প্রতিবাদের ঝড়

কলকাতা, ১ জুন – ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটের পর এবার পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের হাত ধরে বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ‘গুন্ডা দমন বিল’। আইনটির পোশাকী নাম ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। তবে আইনটি পাশ হওয়ার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক নতুন জমানা শুরু হওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন/৩০ জুন) বিধানসভায় তীব্র বাদানুবাদ ও বিরোধীদের একাংশের ওয়াকআউটের মধ্যেই ধ্বনিভোটে (কণ্ঠভোটে) এই বিল পাশ করিয়ে নেয় সরকার। একই সঙ্গে পাশ হয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’।

কী আছে এই নতুন ‘গুন্ডা দমন’ আইনে?

নতুন এই আইনের ধারাগুলো এতটাই কঠোর যে, আইনি বিশেষজ্ঞরা একে ‘মানবাধিকারের পরিপন্থী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

আইনের মূল বিষয়গুলো হলো:

আশঙ্কা থেকেই ১ বছরের জেল: কেউ সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারেন—প্রশাসনের কাছে কেবল এমন ‘আশঙ্কা’ বা সুপ্ত ইচ্ছা রয়েছে মনে হলেই কোনো অপরাধ করার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ১ বছর পর্যন্ত বিনা বিচারে প্রতিরোধমূলক আটকে রাখা যাবে।

আইনজীবী পাওয়ার অধিকার নেই: আটক ব্যক্তির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সরকারি ‘অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ থাকবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি বোর্ডে নিজের পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন না।

সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বুলডোজার অ্যাকশন: সরকার চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট নেতার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এছাড়া সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করলে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।

বিলে সমাজবিরোধী কাজের এক বিশাল পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করা, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দেওয়া, বেআইনিভাবে জমি বা প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করা, এমনকি বন্যপ্রাণী ও বনের ক্ষতি করাকেও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি একা বা কোনো দল বা সিন্ডিকেটের নেতা হিসেবে এই কাজ করলে সরকার তাকে ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে। রাজ্য সরকার, পুলিশ কমিশনার বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (DM) এই আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন।

যোগী আদিত্যনাথের পথে শুভেন্দু? কী বলছেন মুখ্যমন্ত্রী

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই হকার ও বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ শুরু হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে। এই বিল সেই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সমস্ত আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “এই সরকার রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবে না। তবে যারা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করে সমাজে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করবে, তাদের শুধু জেলেই খাটাব না, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব। তিনগুণ ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। কাউকে রেয়াত করা হবে না।”

‘কণ্ঠস্বর রোধের কালো আইন’: ফুঁসে উঠছেন বিরোধীরা

এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করেছে বিরোধী শিবির এবং মানবাধিকার কর্মীরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুণাল ঘোষ একে ‘সংবিধান পরিপন্থী’ উল্লেখ করে বলেন, অপরাধ দমনের জন্য দেশে নতুন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS) থাকতেও এই আইনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, সিপিআইএম নেতা ও প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, “সরকার যেভাবে গরিব হকার ও বস্তিবাসী উচ্ছেদ করছে, তার বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন দানা বাঁধছে, তা ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করতেই এই বিনা বিচারে আটকের আইন আনা হয়েছে।”

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দরিদ্র ও সংখ্যালঘুরা:

মানবাধিকার কর্মী প্রসূন চ্যাটার্জি (যিনি নিজে অতীতে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১০ বছর জেল খেটে খালাস পেয়েছেন) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ইউএপিএ (UAPA)-এর মতোই এই আইনের অপব্যবহার হবে। ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে এই আইনের কারণে বহু আদিবাসী বছরের পর বছর জেলে পচছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এর সবচেয়ে বড় শিকার হবেন দরিদ্র, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।”

প্রবীণ আইনজীবীদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের ‘ডিকে বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য’ মামলার নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা আছে, কাউকে আটক করলে বাধ্যতামূলক কিছু নিয়ম মানতে হবে, কিন্তু এই বিলটি সুপ্রিম কোর্টের সেই যুগান্তকারী রায়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এখন দেখার বিষয়, রাজভবন এবং আদালতের দরজায় আইনি লড়াইয়ের মুখে এই ‘গুন্ডা দমন বিল’ কতটা টিকে থাকে।

এনএন/ ১ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language