চট্টগ্রাম

যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা: ২ ঘণ্টা বন্দুকযুদ্ধে কাঁপল জঙ্গল সলিমপুর, গুঁড়িয়ে দিল আস্ত ক্যাম্প!

চট্টগ্রাম, ২৬ মে – চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুখ্যাত অপরাধের স্বর্গরাজ্য জঙ্গল সলিমপুরে গত রবিবার (২৪ মে) দিবাগত রাত ২টার দিকে এক নজিরবিহীন ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী আলীনগরে অবস্থিত যৌথ বাহিনীর (র‌্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন) ক্যাম্পে এই পরিকল্পিত হামলা চালায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে পুরো পাহাড়ি এলাকা প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী তীব্র বন্দুকযুদ্ধে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি আজ ২৬ মে (মঙ্গলবার) সকাল থেকেই ফেসবুকের নিউজফিড এবং গুগল ডিসকভারে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী ‘ইয়াসিন বাহিনী’ এই হামলাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যাকআপ ফোর্স বা অতিরিক্ত সদস্য যেন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য তারা আগেই জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার প্রধান সড়কের বেশ কয়েকটি অংশের রাস্তা কেটে বড় গর্ত করে দেয় এবং কালভার্ট ভেঙে ফেলে।

শুধু তা-ই নয়, সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল একটি বুলডোজার (এক্সকাভেটর) নিয়ে এসে আলীনগর হাই স্কুলে অবস্থিত যৌথ বাহিনীর নতুন নির্মাণাধীন আধাপাকা ক্যাম্পের দেয়াল ও স্থাপনা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। জানা গেছে, আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নবনির্মিত ক্যাম্পটি উদ্বোধন করার কথা ছিল, যার কাজ ৯০ শতাংশই শেষ হয়ে এসেছিল।

র‌্যাব-৭-এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানের বক্তব্য: “রাত ২টার দিকে সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ জঙ্গল সলিমপুরে আমাদের ক্যাম্পে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি একে-৪৭-এর মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের পক্ষ থেকে ‘নন-লেথাল’ (প্রাণঘাতী নয় এমন) অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দেওয়া হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে এই গোলাগুলি চলে।”

ভয়াবহ এই হামলায় তীব্র গোলাগুলি ও ভাঙচুর চললেও সৌভাগ্যবশত যৌথ বাহিনীর কোনো সদস্য বা বেসামরিক মানুষ হতাহত হননি। গুলির শব্দ শুনে পরবর্তীতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের অতিরিক্ত দল পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা বুলডোজার ফেলে রেখেই গহিন পাহাড়ের ভেতরে পালিয়ে যায়।

গতকাল সোমবার ভোর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকা ঘিরে রেখে এক চিরুনি অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। অভিযানে সন্দেহভাজন ১৫ থেকে ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদ এবং অপরাধের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।

চলতি বছরের গত ৯ মার্চ ৩ হাজারেরও বেশি ফোর্স, ড্রোন ও হেলিকপ্টার নিয়ে এক মেগা অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং ২২ জনকে গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু মূল গডফাদার মো. ইয়াসিন ও রোকন উদ্দিন এখনো পলাতক থাকায় তারা আবার সংগঠিত হয়ে এই দুঃসাহসিক হামলা চালিয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এখানকার অপরাধের নেটওয়ার্ক কতটা গভীরে প্রোথিত। শত শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকায় এই সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো এখন সরাসরি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মুখোমুখি হতেও ভয় পাচ্ছে না। মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা এবং দুর্গম পাহাড়ের সুযোগ নিয়ে ইয়াসিন বাহিনী যেভাবে একের পর এক আত্মগোপন করে হামলা চালাচ্ছে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।

এনএন/ ২৬ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language