যেকোনো উপায়েই হোক হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে! মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চরম হুঁশিয়ারি

ওয়াশিংটন, ২৬ মে – দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকস্মিক বোমাবর্ষণের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যখন আগুন লেগেছে, ঠিক তখনই তেহরানকে লক্ষ্য করে চরম ও চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ যেকোনো উপায়েই হোক পুনরায় উন্মুক্ত করতে ওয়াশিংটন সব ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ভোরে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি (AFP) প্রকাশিত এক বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন থেকে মার্কিন এই শীর্ষ কূটনীতিকের রণহুঙ্কারের কথা জানা গেছে। দোহায় যখন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন, ঠিক তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন কড়া মন্তব্য চলমান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎকে এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
বর্তমানে ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটির জয়পুর শহরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রাসী অবস্থান পরিষ্কার করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: “হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত করতে হবে। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, এই নৌপথটি আমরা খুলে দেবো। তাই এটিকে দ্রুত সচল করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানে বর্তমানে (ইরানের পক্ষ থেকে) যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি, অবৈধ এবং এটি পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলার জবাবে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী এই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। তারা আন্তর্জাতিক নৌপথে মাইন পুঁতে রেখে অ-ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে।
যেহেতু বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই ইরান এটি বন্ধ করার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এরপর গত ৮ এপ্রিল থেকে ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা চললেও, গতকাল সোমবার (২৫ মে) দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনী নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি লক্ষ্য করে মেগা হামলা চালালে পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র এই বক্তব্য এবং গতকালের সেন্টকমের হামলা—সবই আসলে একই সুতোয় গাঁথা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দোহায় শান্তি আলোচনার টেবিলে ইরানকে চুক্তি করতে চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে সামরিক হুমকির সুর চড়াচ্ছেন। একে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বলা হয় ‘ coercive diplomacy’ বা বলপ্রয়োগের কূটনীতি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন এই আগ্রাসী মনোভাবের জবাবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে থাকা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও স্পিডবোটগুলো সক্রিয় করে তোলে, তবে বিশ্ববাজারের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যার খেসারত দিতে হবে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের সাধারণ মানুষকে। বন্দুকের নলের মুখে এই শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে এক নতুন মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এনএন/ ২৬ মে ২০২৬









