কিডনি সুস্থ রাখতে বদলে ফেলুন দৈনন্দিন এই ৬টি ক্ষতিকর অভ্যাস

হয়তো আপনি ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন। বাইরের ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত ফাস্ট ফুড কিংবা অস্বাস্থ্যকর কোমল পানীয় আপনি ছুঁয়েও দেখেন না। কিন্তু হঠাৎ কোনো সাধারণ শারীরিক সমস্যার কারণে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পর জানতে পারলেন—আপনার কিডনি রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্ত! এমন খবর শুনলে যে কেউ আকাশ থেকে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক। মনে প্রশ্ন জাগবে, “আমি সব নিয়ম মেনে চলার পরও এমনটা কীভাবে সম্ভব?”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা অনেকেই জানিনা যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ এবং আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ কিছু অভ্যাস আসলে ‘নীরব ঘাতক’ বা সাইলেন্ট কিলারের মতো কাজ করছে। এগুলো ভেতর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের কিডনিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সময় থাকতে নিজের অজান্তেই করা প্রতিদিনের এমন ৬টি মারাত্মক অভ্যাস এখনই বদলে ফেলা জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক সেগুলো কী কী:
১. পর্যাপ্ত পানি পান না করা (সবচেয়ে বড় ভুল)
সারা দিনের কাজের ব্যস্ততায় পানি পান করার মতো অতি সাধারণ একটি বিষয়কে আমরা অনেকেই একদমই গুরুত্ব দিই না। অথচ শরীরে পানির অভাব হলে কিডনির পক্ষে রক্ত থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান ছেঁকে বের করা সম্ভব হয় না।
পরিণতি: পানি কম খেলে কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) জমতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে অস্ত্রোপচার ছাড়া সারিয়ে তোলা কঠিন। একই সাথে এটি মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণের পথ তৈরি করে।
২. পাতের পাশে কাঁচা লবণ ও অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ
খাবারে রান্না করা লবণ থাকার পরও খাওয়ার সময় পাতের পাশে বাড়তি কাঁচা লবণ নিয়ে বসার অভ্যাস এ দেশের মানুষের ঘরে ঘরে। এছাড়া প্যাকেটজাত চিপস, নোনতা স্ন্যাকস বা ইনস্ট্যান্ট নুডলসেও প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে।
পরিণতি: রক্তে লবণের বা সোডিয়ামের মাত্রা বাড়লে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে রক্তচাপ (High Blood Pressure)। আর এই উচ্চ রক্তচাপ সরাসরি কিডনির রক্তনালীগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এর কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
৩. কথায় কথায় ব্যথানাশক (পেইনকিলার) ওষুধ খাওয়া
সামান্য একটু মাথা ব্যথা, গাঁটে ব্যথা কিংবা সামান্য জ্বর-জ্বর ভাব হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে পেইনকিলার কিনে মুখে পুরে দেন—এমন মানুষের অভাব নেই।
পরিণতি: সাময়িকভাবে ব্যথা কমলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ব্যথানাশক খেলে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল (Kidney Failure) হতে পারে। এসব ওষুধ কিডনিতে রক্তের স্বাভাবিক গতিবেগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
৪. অতিরিক্ত চিনি ও কোমল পানীয় পানের আসক্তি
গরম লাগলেই তৃষ্ণা মেটাতে অনেকে কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস কিংবা সোডা ওয়াটার বেছে নেন। আবার অনেকে বাইরের পানীয় না খেলেও বাড়িতে বারবার চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি মিশিয়ে খান।
পরিণতি: শরীরে বিপুল পরিমাণে চিনি প্রবেশ করলে তা থেকে স্থূলতা (ওবেসিটি) এবং ডায়াবেটিস হতে পারে। আর ডায়াবেটিস হলো কিডনি নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
৫. প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা
“আমি তো রাস্তার চাউমিন বা এগরোল খাই না, শুধু প্যাকেটজাত চিপস, বিস্কুট বা চকোলেট খাই”—এমন ভাবলে ভুল করবেন। প্যাকেটজাত খাবারে দীর্ঘকাল ভালো রাখার জন্য প্রচুর প্রিজারভেটিভস ও সোডিয়াম ব্যবহার করা হয়।
পরিণতি: এসব খাবার প্রতিনিয়ত খেলে তা শরীরে অলক্ষ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আর যাঁরা দীর্ঘদিন হাই ব্লাড প্রেশারে ভোগেন, তাঁদের কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
৬. রাতের পর রাত জাগা বা অপর্যাপ্ত ঘুম
বর্তমানে স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্ক্রোল করতে করতে বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা-সিরিজ দেখতে দেখতে মাঝরাত বা শেষরাত পার করে দেওয়া একটি ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিণতি: চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত ঘুম বা রাতের পর রাত জেগে থাকার ফলে শরীরের স্বাভাবিক মেটাবলিজম নষ্ট হয়, যা নিঃশব্দেই কিডনির স্বাভাবিক ফিল্টারিং কার্যক্রমকে ব্যাহত করে।
প্রাথমিকভাবে দৈনন্দিন এই লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রা পরিবর্তন করা কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। তবে একবার অভ্যাস হয়ে গেলে আপনি নিজেই নিজের শরীরের ইতিবাচক পরিবর্তন টের পাবেন। মনে রাখবেন, কিডনি ড্যামেজ বা বিকল হওয়ার লক্ষণগুলো একদম শেষ মুহূর্তের আগে প্রকাশ পায় না। তাই আজই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন!
এনএন/ ২৪ মে ২০২৬









