
টরন্টো, ১১ মে – সমুদ্রের মাঝখানে একটি জাহাজ। চারদিকে শুধু জলরাশি। সামনে কোনো শহর নেই, পেছনে ফেলে আসা বন্দরের আলোও আর দেখা যায় না। জাহাজের ভেতরে তখনও ভ্রমণের স্বাভাবিক আনন্দ। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ নতুন পরিচয়ে ব্যস্ত, কেউ ডেকে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ আটলান্টিকের বিশালতা দেখছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই অদৃশ্যভাবে ঢুকে পড়েছিল এক প্রাণঘাতী ভাইরাস।
প্রথমে কেউ বুঝতে পারেননি। একজন প্রবীণ ডাচ যাত্রী জ্বরে পড়লেন। মাথাব্যথা, দুর্বলতা, তারপর শ্বাসকষ্ট। জাহাজের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরও তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১১ এপ্রিল তিনি জাহাজেই মারা যান।
এরপর মৃত যাত্রীর স্ত্রীও অসুস্থ হলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার পর তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনিও মারা যান। এরপর আরেক জার্মান নারী যাত্রীর মৃত্যু হয়। একে একে কয়েকজনের শরীরে দেখা দিতে থাকে একই ধরনের লক্ষণ। জ্বর, দুর্বলতা, শ্বাস নিতে কষ্ট। সমুদ্রের ওপর ভাসমান ক্রুজ জাহাজটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক অজানা স্বাস্থ্য সংকটের কেন্দ্রে। পরীক্ষার পর রোগের নাম জানা গেল। হ্যান্টাভাইরাস।
২০২৬ সালের ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে এমভি হন্ডিয়াস নামের ক্রুজ জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। গন্তব্য ছিল অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আটলান্টিকের দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ। জাহাজে ছিলেন ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য। তাঁরা এসেছিলেন ২৩টি দেশ থেকে। শুরুতে এটি ছিল স্বপ্নের ভ্রমণ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ভ্রমণ হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয়।
২ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জাহাজে গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কথা জানানো হয়। ৬ মে সংস্থাটি জানায়, এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসটি হলো Andes virus। এটি হ্যান্টাভাইরাস পরিবারের একটি ধরন। সাধারণত হ্যান্টাভাইরাস ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত প্রাণীর মলমূত্র বা লালার সংস্পর্শে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। Andes virus খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে।
১১ মে পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এমভি হন্ডিয়াসের সঙ্গে যুক্ত সাতটি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। মোট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়। মারা গেছেন তিনজন। আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন দেশে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, একজন ফরাসি ও একজন আমেরিকান যাত্রীর শরীরেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
এই রোগের ভয়াবহতা হলো, শুরুতে এটি সাধারণ জ্বর বা ফ্লুর মতো মনে হতে পারে। পরে দ্রুত শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। Hantavirus Pulmonary Syndrome বা HPS হলে ফুসফুস আক্রান্ত হয় এবং রোগীর অবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। সংক্রমণ বিরল হলেও গুরুতর। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুহার অনেক বেশি হতে পারে।
অনুসন্ধানকারীরা এখন যাত্রীদের ভ্রমণপথ খতিয়ে দেখছেন। আর্জেন্টিনার পাতাগোনিয়া অঞ্চলে Andes virus স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজে ওঠার আগে কোনো যাত্রী ইঁদুরের উপস্থিতি থাকা পরিবেশে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। এরপর জাহাজের সীমিত পরিসর, যাত্রীদের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা এবং রোগ শনাক্তে দেরি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
সংক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জাহাজটি কিছু সময় পশ্চিম আফ্রিকার কেপ ভার্দের কাছে অবস্থান করছিল। পরে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফেতে নোঙরের অনুমতি পায়। সেখান থেকে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিচ্ছিন্ন রাখা এবং নিজ নিজ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা শুরু হয়।
কানাডার জন্যও ঘটনাটি নজরকাড়া। কানাডার জনস্বাস্থ্য সংস্থার ৭ মে পর্যন্ত মূল্যায়ন অনুযায়ী, জাহাজে ছয়জন কানাডীয় নাগরিক ছিলেন। সে সময় পর্যন্ত তাঁদের কেউ উপসর্গযুক্ত ছিলেন না। তবে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জারি রাখা হয়েছে। বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আক্রান্ত হলে রোগটি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এমভি হন্ডিয়াসের ঘটনাটি কেবল একটি ক্রুজ জাহাজের দুর্ভাগ্যজনক স্বাস্থ্য সংকট নয়। এটি বৈশ্বিক ভ্রমণের যুগে আমাদের সময়ের এক সতর্ক সংকেত। একটি জাহাজ, কয়েকটি দেশ, শতাধিক যাত্রী এবং একটি বিরল ভাইরাস দেখিয়ে দিল, কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের সংক্রমণও মুহূর্তে আন্তর্জাতিক উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। তাই ভয় নয়, তথ্যই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর সচেতন প্রতিরোধই এমন অদৃশ্য বিপদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
তথ্যসূত্র:
Reuters, ১১ মে ২০২৬
The Guardian, ১১ মে ২০২৬









