জাতীয়

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি: আইএমএফের হিসাবে দেশের রিজার্ভ এখন ৩১ বিলিয়ন ডলারের পথে

ঢাকা, ৮ মে – দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আর চাপের পাহাড় ডিঙিয়ে অবশেষে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত ‘বিপিএম-৬’ পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ এখন প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারের দোরগোড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৭ মে) পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬২ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে। ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছোঁয়ার পর বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে যে ধস নেমেছিল, গত কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় সেই ক্ষত এখন কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবককে চিহ্নিত করেছেন:

১. রেমিট্যান্সের জোয়ার: ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। হুন্ডি রোধে কড়াকড়ি এবং ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার সুফল মিলছে এখন।
২. রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা: বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
৩. আমদানি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য: অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের ফলে ডলারের বহিঃপ্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন আর বাজারে আগের মতো বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না।

এছাড়া বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে অর্থের ছাড় সময়মতো হওয়াকেও রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার অর্থ হলো দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া। বর্তমানের এই রিজার্ভ দিয়ে অনায়াসেই কয়েক মাসের আমদানি দায় মেটানো সম্ভব। এর ফলে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা: ডলারের সংকট কমলে বাজারে অস্থিরতা কমবে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। এছাড়া রিজার্ভ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় এবং ক্রেডিট সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে রিজার্ভের দুটি হিসাব নিয়ে। গ্রস রিজার্ভ: এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা মোট বৈদেশিক সম্পদ। এর মধ্যে এমন কিছু তহবিল থাকে যা তাৎক্ষণিকভাবে খরচ করা যায় না।

বিপিএম-৬: এটি আইএমএফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। এখানে কেবল সেই অর্থই দেখানো হয় যা সরকার যেকোনো প্রয়োজনে সাথে সাথে ব্যবহার করতে পারবে। বর্তমানে সারাবিশ্বেই এই বিপিএম-৬ হিসাবকেই প্রকৃত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের চূড়া থেকে রিজার্ভ নামতে নামতে এক পর্যায়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর জ্বালানি সংকটের সেই দুঃসময় কাটিয়ে ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরে আসা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক। তবে এই ধারা অব্যাহত রাখতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলা করে যেতে হবে।

এনএন/ ৮ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language