সম্পাদকের পাতা

কানাডার অভিবাসন আইনে বড় পরিবর্তন

নজরুল মিন্টো

কানাডার নাম একসময় পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের কাছে ছিল আশ্রয়, স্থিতি এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। পড়াশোনা, কাজ, নিরাপদ জীবন কিংবা রাজনৈতিক সুরক্ষার আশায় অসংখ্য মানুষ এই দেশকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সময় বদলেছে। জনসংখ্যার চাপ, আবাসন সংকট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এখন কানাডা তার অভিবাসন নীতিকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত রূপ দিচ্ছে। ২০২৬ সালে কার্যকর হওয়া নতুন আইন সেই পরিবর্তনেরই বড় প্রকাশ।

Bill C-12 নামে নতুন এই আইন ২৬ মার্চ ২০২৬ আইনে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার উদ্দেশ্যে আনা এই আইনকে কয়েক দশকের মধ্যে কানাডার অভিবাসন কাঠামোয় অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার বলছে, এটি কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, নিয়ন্ত্রিত এবং অপব্যবহারমুক্ত করার প্রচেষ্টা।

নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আশ্রয়ব্যবস্থায় কড়াকড়ি। বিশেষ করে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী দাবি উত্থাপনকারী ব্যক্তি এবং সীমান্ত পেরিয়ে সুরক্ষা খোঁজা মানুষের জন্য এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এখন দু ধরনের ক্ষেত্রে আশ্রয় আবেদন অযোগ্য বিবেচিত হবে। প্রথমত, কেউ যদি কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে আশ্রয় দাবি করেন, তবে তার আবেদন আর গ্রহণ করা হবে না। তবে এই এক বছরের সময়সীমা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়; এটি শুধু তাদের জন্য কার্যকর, যারা ২৪ জুন ২০২০ এর পর কানাডায় প্রবেশ করেছেন। দ্বিতীয়ত, কেউ যদি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত দিয়ে নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেন, তার দাবিও অযোগ্য বলে গণ্য হবে। এই বিধানগুলো ৩ জুন ২০২৫ থেকে করা দাবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে।

সরকারের বক্তব্য হলো, শরণার্থী ব্যবস্থা এমন মানুষের জন্য, যারা বাস্তব বিপদ থেকে পালিয়ে দ্রুত সুরক্ষা চান। কিন্তু অনেকেই এই ব্যবস্থাকে স্থায়ী বসবাসের একটি সহজ পথ বা শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিলেন। নতুন সময়সীমা আরোপের মাধ্যমে সেই সুযোগ বন্ধ করাই সরকারের লক্ষ্য। অর্থাৎ কেউ কানাডায় প্রবেশের পর এক বছরের বেশি সময় পার করে পরে আশ্রয় দাবি করলে সরকার এখন তা আর সহজভাবে নেবে না।

শুধু আশ্রয় দাবির সময়সীমা বেঁধে দিয়েই সরকার থেমে থাকেনি। একই সঙ্গে আবেদনকারীর তথ্য যাচাই, ভুয়া পরিচয় শনাক্ত এবং ইমিগ্রেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতারণার জাল ভাঙার দিকেও নজর বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ নতুন আইন শুধু কে কখন আবেদন করবে, তা নিয়েই নয়; বরং কে কী তথ্য দিচ্ছে, কে কাকে ভুল পথে নিচ্ছে, সেটিও এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

নতুন আইনের ফলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এখন অন্য ফেডারেল ও প্রভিন্সিয়াল দপ্তরের সঙ্গে আবেদনকারীদের তথ্য মিলিয়ে দেখার আরও বিস্তৃত সুযোগ পাবে। এর ফলে একজন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন তথ্য দিয়ে বা একাধিকভাবে সিস্টেমে ঢোকার চেষ্টা করলে তা ধরা সহজ হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য সরকারি নথি ও রেকর্ডের সঙ্গে মেলে কি না, সেটিও আরও কার্যকরভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। সরকার বলছে, এতে তথ্যের অসঙ্গতি ধরা, জালিয়াতি ঠেকানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও নির্ভরযোগ্য করা সহজ হবে।

ইমিগ্রেশনকে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরেই এক ধরনের প্রতারণার ব্যবসা গড়ে উঠেছে। কেউ নিজেকে অনুমোদিত পরামর্শদাতা বা RCIC পরিচয় দিয়ে, কেউ আবার সহজে ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়। নতুন ব্যবস্থায় এমন অসাধু প্রতিনিধি ও ভুয়া পরামর্শদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তি অনেক কঠোর করা হয়েছে। ভুল তথ্য দিতে উৎসাহ দেওয়া, জালিয়াতিমূলক আবেদন তৈরি করা বা প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে কানাডায় আনার চেষ্টা করলে এখন বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। সরকারের নথিতে সর্বোচ্চ ১.৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানার কথাও উল্লেখ আছে।

যেসব আশ্রয় আবেদন অযোগ্য বলে ধরা হবে, সেগুলো আর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডে পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য যাবে না। সহজ কথায়, আবেদনকারী তার মামলা স্বাভাবিক নিয়মে বিচারকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ হারাবেন। তবে তাদের জন্য একটি সীমিত বিকল্প রাখা হয়েছে। তারা Pre Removal Risk Assessment বা PRRA এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর অর্থ হলো, কাউকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে দেখা হবে, নিজ দেশে ফিরে গেলে তিনি নির্যাতন, নিপীড়ন বা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বেন কি না। তবে এই প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় শুনানির বিকল্প নয়। ফলে আবেদনকারীর আইনগত সুযোগ আগের তুলনায় কমে যাবে।

এই আইনের প্রভাব শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিক অভিবাসন কাঠামোতেও এর প্রতিফলন রয়েছে। কানাডা ইতোমধ্যে স্থায়ী বাসিন্দা, অস্থায়ী কর্মী এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। সরকার মনে করছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সে কারণেই এখন আর আগের মতো সংখ্যাভিত্তিক সম্প্রসারণ নয়, বরং বাছাই করে গ্রহণের নীতি সামনে আনা হচ্ছে।

কানাডার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সেনেট বিলটি পর্যালোচনার সময় একটি সংশোধনী যুক্ত করেছে। সেই সংশোধনী অনুযায়ী, এক বছরের সময়সীমার কারণে কত আশ্রয় আবেদন অযোগ্য বিবেচিত হলো এবং সেইসব ক্ষেত্রে কতজন PRRA এর আবেদন করলেন, সে তথ্য সরকারকে সংসদে জানাতে হবে। ফলে নতুন আইনের মানবিক প্রভাব পুরোপুরি আড়ালে থাকবে না। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হলে এই পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে কানাডার নতুন অভিবাসন আইন একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। সরকার আর আগের মতো উন্মুক্ত কাঠামোয় অভিবাসন পরিচালনা করতে চায় না। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে যারা কানাডাকে স্বপ্নের গন্তব্য হিসেবে দেখছেন, তাদেরও বুঝতে হবে যে সেই পথে এখন কড়াকড়ি অনেক বেড়েছে। কানাডার দরজা এখন আর সবার জন্য সমানভাবে খোলা নয়। বরং পুরো প্রক্রিয়াই হয়ে উঠছে আরও বেশি শর্তসাপেক্ষ, আরও বেশি যাচাইনির্ভর এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর।

তথ্যসূত্র:
Immigration, Refugees and Citizenship Canada (২৭ মার্চ ২০২৬)
Parliament of Canada, LEGISinfo (২৬ মার্চ ২০২৬)
CIC News (২৭ মার্চ ২০২৬)
Immigration.ca (২৭ মার্চ ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language