
ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এক শহরের নাম ইপসউইচ। ধীরে বয়ে যাওয়া নদী অরওয়েল, পুরোনো ইটের বাড়ি আর মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে ভরা এই শহরের প্রতিটি ভোর নিজের মতো করে আলো ছড়ায়। বহু দশক ধরে এখানে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি শক্তিশালী কমিউনিটি। বিশেষ করে বাংলাদেশি অভিবাসীরা এই শহরকে নিজেদের নতুন ঠিকানা বানিয়ে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় কেন্দ্র, যা নগরটির সামাজিক জীবনে বিশেষ অবদান রাখছে।
দীর্ঘ তিন দশক আগে এই শহরেই ঘটে এমন একটি ঘটনা যা সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। সময়ের পরতে পরতে চাপা পড়ে থাকা এক ভয়ংকর সত্য হঠাৎই আবার সামনে এসেছে। সবাই যখন ভেবেছিল ঘটনাটি অতীতের কুয়াশায় হারিয়ে গেছে, তখনই যেন অন্ধকার চিরে ফিরে এসেছে সেই গল্প। পুরো ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি এ ঘটনা নিয়ে আলোচনায় মুখর, কেউ বিস্মিত, কেউ শোকাহত।
২৫ নভেম্বর ২০২৫। ইপসউইচ ক্রাউন কোর্টের এক ব্যস্ত দিন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মানুষটি ৭১ বছর বয়সী হাফেজ আশরাফ উদ্দিন। লন্ডনের বার্কিং এলাকার উইভেনহো রোডের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে স্থানীয় সমাজে পরিচিত ছিলেন। অভিভাবকেরা বিশ্বাস করতেন, তাদের সন্তানরা তার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা পেয়ে সঠিক পথে বড় হবে। সেই বিশ্বাসই তাকে কমিউনিটিতে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯, মোট চৌদ্দ বছরের ব্যবধানে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছয়জন মেয়ের ওপর তিনি ধারাবাহিকভাবে অশালীন আচরণ চালিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। মোট ২২টি অভিযোগের মধ্যে আদালতে প্রমাণিত হয় ১৩টি। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের শিক্ষকের মর্যাদাকে ব্যবহার করে শিশুদের জামার ভেতর হাত দিতেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ করতেন। চারটি অভিযোগ ছিল একাধিকবার সংঘটিত অপরাধের ভিত্তিতে, যা প্রমাণ করে তার অবৈধ কাজের সংখ্যা কমপক্ষে ঊনত্রিশ।
সেই সময় ভুক্তভোগীরা ছিল অল্পবয়সী শিশু। বড় হওয়ার পরেও কেউ পরিবারের সাথে বিষয়টি শেয়ার করতে পারেনি। অজানা এক ভয়, সামাজিক লজ্জা আর ধর্মীয় শিক্ষকের প্রতি চেপে রাখা সম্মান তাদের চুপ করে রেখেছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে এক ভুক্তভোগী অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে একটি সহায়তা সংস্থাকে ঘটনাটি জানান। সেখান থেকেই বিষয়টি প্রথম পুলিশের কাছে পৌঁছায়। পরে অন্য ভুক্তভোগীরাও সামনে আসেন।
ভুক্তভোগীদের সাহসী স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত সম্পন্ন করে মামলা আদালতে তোলে। এরপর গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয় চার সপ্তাহব্যাপী বিচার। জুরি বোর্ড শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়, হাফেজ আশরাফ উদ্দিন দোষী। বিচারক পর্যবেক্ষণে বলেন, তিনি কমিউনিটিতে নিজের সম্মানিত অবস্থানকে ব্যবহার করে ছোট ছোট মেয়েদের ভয় দেখিয়ে রেখেছিলেন এবং বছরের পর বছর তাদের মুখ বন্ধ করে রাখতে বাধ্য করেছিলেন।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটেনের মূলধারার সংবাদমাধ্যম Suffolk News, Ipswich Star, BBC Suffolk সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যারা একসময় মনে করতেন বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে, তারা এখন বুঝতে পারছেন আদালত কোনো অপরাধকে ভুলে যায় না।
গত ২৫ নভেম্বরের শুনানিতে বিচারক কঠোর ভাষায় হাফেজ আশরাফ উদ্দিনকে ভর্ৎসনা করেন। আদালত তাকে বারো বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে। পাশাপাশি আজীবন সেক্স অফেন্ডারস রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেক্সুয়াল হার্ম প্রিভেনশন অর্ডারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত মন্তব্য করে যে পরিবারগুলো কখনও ভাবতেই পারেনি, যাকে তারা ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্র দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন, তিনি সেই বিশ্বাসের এমন ভয়ংকর অপব্যবহার করতে পারেন। অভিভাবকেরা সন্তানদের তার কাছে পাঠিয়েছেন নৈতিক মূল্যবোধ শেখার জন্য, কিন্তু তারা জানতেন না সেই শিক্ষকের ভেতরে লুকিয়ে ছিল পাশবিক প্রবণতা।
দক্ষিণ অঞ্চল সেফগার্ডিং ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ডোনা হপার বলেন, “অল্পবয়সী মেয়েদের ওপর যে ভয়ংকর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবে আজও তাদের তাড়া করে।” তিনি আরও বলেন, “সামাজিক লজ্জা ও তার উচ্চ মর্যাদা ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন চুপ করে রেখেছিল। এই বিচার প্রমাণ করে যে ন্যায়বিচারের পথে সময় কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।”
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাফেজ আশরাফ উদ্দিন হয়তো ভেবেছিলেন বয়স এবং সময় তাকে রক্ষা করবে। ভুক্তভোগীরা কথা বলবে না, এটাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের দৃঢ়তা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস তাকে শেষ বয়সে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পর ইংল্যান্ডের বাংলাদেশি সমাজে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ ভাবছেন, এখনও হয়তো অনেক অপ্রকাশিত গল্প রয়ে গেছে। কেউ বিস্ময়ে স্তব্ধ, কেউ গভীর অস্বস্তিতে। অভিভাবকেরা নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
এই মামলার রায় কেবল একটি অপরাধের বিচার নয়। এটি প্রমাণ করেছে যে সত্যকে চাপা রাখা যায়, ভুলিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।
তথ্যসূত্র:
১. Suffolk News (26 November 2025)
২. Ipswich Star (26 November 2025)
৩. BBC Suffolk (26 November 2025)
৪. UKNIP News (27 November 2025)









