
মোরশেদা ও গালিবের টার্গেট ছিল মূলত পরিচিত নারীরা। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর স্নেহ, তারপর ধীরে ধীরে নির্ভরতা তৈরি করাটা ছিল তাদের কৌশল। মোরশেদা হাসিমুখে কাছে আসতেন, আপনজনের মতো কথা বলতেন, মন খুলে জীবনের গল্প শোনাতেন। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সেতু তৈরি করে তিনি মহিলাদের কনভিন্স করতেন যে, তাদের জন্য তার কাছে আছে এক বিশেষ সুযোগ।
কিছু নারী মোরশেদাকে বোনের মতো আপন করে নিয়েছিলেন। বিশ্বাস করেছিলেন তার পরামর্শ। আর সেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়েই শুরু হয়েছিল ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্নের পথচলা। এই বিশ্বাসভঙ্গের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি হলো লুবনা চৌধুরির গল্প।
২০১৯ সালে লুবনা চৌধুরি কানাডায় আসেন। এর আগে তিনি সিঙ্গাপুরে ১৪ বছর কাটিয়েছেন। সিঙ্গাপুরের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, নির্ভরতার পরিবেশ থেকে তিনি যখন কানাডায় এলেন, নতুন জীবনের স্বপ্ন ছিল উজ্জ্বল আর আশাব্যঞ্জক। সেই স্বপ্ন থেকেই তিনি টরন্টো থেকে ১১৪ কিলোমিটার দূরের বেরি শহরে কিনেছিলেন একটি লাক্সারিয়াস কন্ডো। ছয় লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ডলারের সেই কন্ডোটি ছিল তাঁর গর্ব, তাঁর নিরাপত্তা, তাঁর সমগ্র পরিশ্রমের ফসল। তিনি পুরো কন্ডোটির লোন শোধ করে ফেলেছিলেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।

এসময় লুবনার পরিচয় হয় মোরশেদার সঙ্গে। এক কাজিনের মাধ্যমে শুরু হওয়া পরিচয় দ্রুতই ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। একসাথে পার্টি, একসাথে মেলামেশা, আর সময়ের সঙ্গে তা যেন হয়ে ওঠে বোনের মতো সম্পর্ক। কানাডার অপরিচিত জীবনে এই সম্পর্কটি লুবনার কাছে হয়ে ওঠে ভরসার জায়গা।

২০২৪ সালের একদিন মোরশেদার ফোন এলো। তার গলায় উত্তেজনা। তিনি বললেন, “লুবনা, তোমার জন্য একটা ফাটাফাটি অফার আছে। বিশাল কোম্পানি, মাসে দুই শতাংশ লাভ দেবে। বছরে চব্বিশ শতাংশ। এমন সুযোগ জীবনে একবার আসে। তুমি ইনভেস্ট করো, আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিলাম। যদি কিছু হয় প্রয়োজনে আমার বাড়ি বিক্রি করে তোমার টাকা ফেরত দেবো।” এরপর কি আর কথা থাকে?
লুবনা তার স্বামীকে রাজি করান। মোরশেদার নির্দেশে তারা তাদের সম্পূর্ণ পেইড–অফ কন্ডোটি বন্ধক রেখে মাসিক চার হাজার ডলার সুদে এক ইহুদি লেন্ডারের কাছ থেকে চার লক্ষ ডলার লোন নেন। মোরশেদাই লোনটির সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ব্যাংক থেকে লোন না নিয়ে প্রাইভেট লেন্ডারের পথ কেন? উত্তরে মোরশেদা বলেন, “ব্যাংক থেকে নিলে ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাক করবে, ঝামেলা করবে।”

ইনভেস্ট করার পরের মাস থেকেই লভ্যাংশ আসা শুরু হয়। লাবন্য খুশি, তার স্বামীও খুশি। ছয় মাস ধরে নিয়মিত লভ্যাংশ পেয়ে তাদের জীবন ভরে যায় আনন্দে, পরিকল্পনায়, আর নতুন স্বপ্নে।

কিন্তু হঠাৎ লভ্যাংশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। মোরশেদাকে ফোন করলে তিনি বলেন, “কোম্পানি CRA–এর সঙ্গে কিছু ইস্যুতে পড়েছে, খুব শিগগিরই সমাধান হবে।”
এক সপ্তাহ কাটে, তারপর আরেক সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে মাস যায়, কিছুই হয় না। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায় তিনি প্রতারণার শিকার। অর্থ ফেরত চাইতেই মোরশেদার গলা বদলে যায়। “আমাদের কিছু করার নেই,” তিনি বলেন।
এই সময়ের মধ্যেই শুরু হয় ভয়ংকর মানসিক চাপ। প্রাইভেট লেন্ডারের সুদ জমা হতে থাকে। নোটিশ আসে। হুমকি আসে।

প্রতি মাসে চার হাজার ডলার সুদ দিতে দিতে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মানসিক চাপ ও আর্থিক বিপর্যয়ে লুবনার স্বামী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকেন। অবশেষে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক ভোরবেলা তিনি স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন। লুবনার জীবনে নেমে আসে ঘন অন্ধকার।
স্বামীর মৃত্যুর পর লুবনা আরও অসহায় হয়ে পড়েন। যারা বলেছিল “ঝুঁকি নেই”, “গ্যারান্টি আছে”, তারা ইত্যবসরে কেটে পড়েছে।
প্রাইভেট লেন্ডারের দাবির পরিমাণ বেড়েই চলে। উপায়ন্তর না দেখে লুবনা তার জিনিষপত্রসহ কন্ডো ছেড়ে দিয়ে এক অন্ধকার বেসমেন্টে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
কিন্তু এতেই ঘটনার শেষ হয়না। প্রাইভেট লেন্ডার এখন আরও আশি হাজার ডলার দাবি করে মামলা ঠুকে দিয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাবন্য বলেন, “মানুষ এতটা নিষ্ঠুর, এতটা বেঈমান কীভাবে হতে পারে?”
সাম্প্রতিক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনাটি হলো অটোয়ার আদনান-সাদিয়া দম্পতির তিন লাখ ডলার হারানোর খবর। তারাও বিশ্বাস করেছিলেন এই দম্পতির আশ্বাসে। মোর্শেদা ও গালিব তাদের দেখিয়েছিলেন দ্রুত লাভের স্বপ্ন।
আদনান বলেন, “যাদের ওপর সারা জীবন ভরসা করেছি তাঁদের কারণে আমার পরিবার আজ গভীর আর্থিক বিপর্যয়ে।” আদনান দম্পতিকে এখন নতুন করে পনের বছরের মর্টগেজ পরিশোধ করতে হবে। যে বিনিয়োগ তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল তা-ই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও অনেকে আছেন, যারা মোরশেদা ও গালিবের পাল্লায় পড়ে লাখ লাখ ডলার খুইয়েছেন। ঢাকার নামকরা ফ্যাশন হাউসের একজন পরিচালক এদের ফাঁদে পড়ে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না, মিডিয়ার সামনেও আসতে চান না, কারণ এই বিপর্যয়ের কথা উচ্চারণ করলেই পরিবারের মান–সম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সব ধরনের সামাজিকতা এড়িয়ে তিনি এখন নিভৃতে দিন কাটাচ্ছেন।

মোরশেদা শরিফ ছন্দা ও মাসুদ গালিবকে ঘিরে যে প্রতারণার অভিযোগ সামনে এসেছে, তার ভিত্তি কেবল ভুক্তভোগীর বক্তব্য নয়। বরং আইনি নথি, অভ্যন্তরীণ স্বীকারোক্তি, ব্যাংক রেকর্ড, এবং কোম্পানির পরিচালনা–সংক্রান্ত সরকারি ফাইলিং সবকিছু মিলিয়ে এটি আজ একটি পূর্ণাঙ্গ নথিভুক্ত জালিয়াতির মামলা।
HYWI Capital–এর ভেতরের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা মার্ক কামিংসের দীর্ঘ ইমেইলে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব তথ্য। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে মোরশেদা এক মিলিয়নের বেশি কমিশন পেয়েছেন, Mortgage Alliance পেয়েছে আরেক মিলিয়ন, আর গালিব নগদ ও অন্যান্য চুক্তি মিলিয়ে পেয়েছেন সত্তর হাজার ডলারেরও বেশি। এই সকল কমিশন আদায় হয়েছে Ontario-র Mortgage Brokerages, Lenders and Administrators Act–এর বিধান লঙ্ঘন করে।
স্বীকারোক্তিমূলক সেই ইমেইলে আরও উঠে এসেছে যে মোরশেদা বহু ক্লায়েন্টের আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছেন, নকল চাকরির চিঠি তৈরি করেছেন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরিবর্তন করেছেন, এমনকি CRA নথিও সাজিয়েছেন। এই অভিযোগগুলো কেবল কথার কথা নয়; আইনি নথিপত্রে পাওয়া গেছে সেই বদলানো কাগজপত্রের কপি, ভুক্তভোগীদের পাঠানো ইমেইল, লোন অ্যাপ্লিকেশনে জমা দেওয়া ভুয়া ডকুমেন্ট, এবং ব্যাকডেট করা চুক্তি।
আরও রয়েছে এক ভুক্তভোগীর পাঠানো ব্যাংক ট্রান্সফার রসিদ, যেখানে বাড়ি রক্ষার জন্য পাঠানো ৩১,৬৯৯ ডলার মোরশেদা আইনজীবীর কাছে পাঠানোর কথা বললেও বাস্তবে সেই অর্থ নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন। পরবর্তীতে একই ভুক্তভোগীর কাছ থেকে গোপনে আরও তিন হাজার ডলার নেওয়ার প্রমাণও জমা হয়েছে।
মোরশেদা ও গালিব দম্পতির বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাঁরা শুধু মর্টগেজ বা বিনিয়োগ প্রতারণাতেই নয়, মানি লন্ডারিংয়ের সাথেও জড়িত। কমিশনের বিনিময়ে তারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় টাকা আনিয়ে দিতেন। বিতর্কিত ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক লুটেরা এস. আলমসহ দেশের কিছু বিত্তশালী ব্যক্তি যারা বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট করেছেন, তাঁদের সেই লুটের টাকা কানাডায় পাচারে সহায়তা করা এবং কালো টাকা সাদা করার গোপন পথ তৈরি করে দিতেন এই দম্পতি। তাদের ভূমিকা ছিল মধ্যস্থতাকারীর মতো, আর সেটাই হয়ে উঠেছিল অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের আরেকটি অন্ধকার উৎস।
ক্রমশ অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকায় আরসিএমপির একটি বিশেষ টিম এখন এ দম্পতির বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রায় তদন্তে নেমেছে। কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীদের একে একে জবানবন্দি নিচ্ছেন, টাকার প্রবাহ কোথা থেকে কোথায় গেছে তা মিলিয়ে দেখছেন, ব্যাংকের নথি টেনে দেখছেন, আর প্রতিটি সূত্রকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনুসন্ধান করছেন। সত্য উন্মোচিত হচ্ছে একের পর এক। আশা করা হচ্ছে, তদন্ত সম্পূর্ণ হলে মোরশেদা ও গালিবের লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে জেল, জরিমানা এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ প্রতিবেদনের লক্ষ্য হলো মোরশেদা শরিফ ও মাসুদ গালিব দম্পতির প্রতারণার গল্প কমিউনিটির মানুষ জানুক। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হোক। এদের মতো আরও অনেক রিয়েলটর, অনেক মর্টগেজ এজেন্ট, অনেক আইনজীবী, অনেক সিপিএ, অনেক ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট আমাদের কমিউনিটিতে মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ বড় বড় অনুষ্ঠানের প্রাইম স্পন্সর হয়ে প্রধান অতিথি/বিশেষ অতিথির আসন অলঙ্কৃত করছে।

এসব প্রতারকরা মনে করে মানুষ ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন তাদের বিশাল কৃতিত্ব। তাদের বিশ্বাস, প্রতারণার টাকায় গড়া বাড়ি আর দামি গাড়ি হাঁকানোই সামাজিক মর্যাদা। তারা ভাবে অন্যের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করা তাদের অধিকার। আর অর্থের বিনিময়ে মঞ্চ আলোকিত করে এওয়ার্ড নেওয়াকে তারা নিজেদের জীবনের শীর্ষ অর্জন মনে করে।

মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে, এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু সচেতন মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে, প্রতারণার অন্ধকার ততটাই ক্ষীণ হয়ে আসবে। কমিউনিটির সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও সচেতন হতে হবে। কারা প্রকৃত সম্মানের যোগ্য, কারা নয়, কাকে স্পন্সর হিসেবে প্রমোট করা উচিত, কাকে নয়—এই মৌলিক বিবেকবোধ জাগ্রত থাকলে সমাজ অনেকটাই নিরাপদ থাকে।

লেক সিমকোর ধারে অবস্থিত ফ্রাইডে হারবার। এই বিলাসবহুল রিসোর্ট কমিউনিটিতে কানাডার ধনকুবেররা থাকেন। এখানে রয়েছে ব্যক্তিগত নৌঘাট, মারিনা, গলফ কোর্স, রিসোর্ট-মানের রেস্তোরাঁ, আর এমন সব বাড়ি যার দাম সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। আলোচিত দম্পতি আজ এই অভিজাত এলাকাতেই একটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক। সূর্য ডোবার সময় লেকের জলে যে ঝিলিক ওঠে, তাতে প্রতিফলিত হয় মোরশেদা–গালিব দম্পতির আড়ম্বরপূর্ণ জীবন, আর সেই আলোতেই অদৃশ্যভাবে ভেসে ওঠে প্রতারিত মানুষের জমে থাকা ব্যথা, সেই ব্যথার অশ্রু।

বি. দ্র. ‘দেশে বিদেশে’র পক্ষ থেকে মোরশেদা ও গালিবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। ফোন করা হলেও তাঁরা ধরেননি, কলব্যাকও করেননি। বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর মেলেনি।’
তথ্যসূত্র:
১) Ontario Superior Court of Justice, Statement of Claim (Amended), CV-25-736118
২) Statement of Defence and Crossclaim, Grzegorz Wojcik et al.
৩) Affidavit of Service, Nadiya V. Crooker
৪) ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
৫) কমিউনিটি সদস্যদের সরবরাহ করা আর্থিক নথি
বিশেষ আহবান:
প্রিয় পাঠক, আপনাদের মধ্যে কেউ কি প্রতারণার শিকার হয়েছেন? আপনি নিশ্চয় চান না আপনার মতো আর কেউ প্রতারিত হোক, কোনো পরিবারের শান্তি নষ্ট হোক। প্রতারণা তখনই শক্তি পায় যখন ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। তাই নীরবতা ভাঙুন, আপনার গল্পটি আমাদের বলুন। সাহস করে এগিয়ে আসুন। আপনার বলা সত্য প্রতারকদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারে।









