জাতীয়

স্মার্টকার্ড বিতরণ করতে সিইসি নাসির উদ্দিন এখন কানাডায়

দুলাল আহমেদ চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন এখন কানাডায় ১৪ দিনের সরকারি সফরে। গত শুক্রবার তিনি টরন্টো পৌঁছালে কানাডায় বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার কাজী রাসেল পারভেজ এবং টরন্টোয় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. ফারুক হোসেন বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান। তিনি ৯ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত হোটেল প্যানপ্যাসিফিক টরন্টোয় অবস্থান করবেন। সিইসির সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন লালমনিরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবির সরকার।

উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট
নির্বাচন কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, সিইসির এ সফরের উদ্দেশ্য—কানাডায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বিতরণ। তবে উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৭ মে টরন্টো ও ৯ মে অটোয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে এনআইডি সেবা চালু করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ এবং আইডিইএ প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল টরন্টো ও অটোয়ায় ছয় দিন অবস্থান করে তাঁদের উপস্থিতিতেই এ কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কারিগরি ত্রুটি—বিশেষ করে সার্ভার–সংক্রান্ত জটিলতা—এবং অনুমোদনের নানা প্রক্রিয়াগত সমস্যার কারণে এই সেবা শুরু থেকেই মন্থর গতিতে চলছে।

স্মার্টকার্ড বিতরণ: ‘শতাধিক’ হাতে নিয়েই আগমন
নির্বাচন কমিশন, ঢাকা সূত্র জানায়, টরন্টো ও অটোয়ায় গত প্রায় চার মাসে প্রস্তুত হওয়া মাত্র ‘শতাধিক’ স্মার্টকার্ড সিইসি সঙ্গে করে এনেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি টরন্টো ও অটোয়ার মিশনে ছোট পরিসরে বাছাইকৃত কিছু ব্যক্তির উপস্থিতিতে এসব কার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করবেন এবং চার মাস আগে চালু হওয়া ভোটার কার্যক্রমের ‘উদ্বোধনী’ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন  করবেন।

টরন্টো অংশ: ৫–৮ সেপ্টেম্বর
৫ সেপ্টেম্বর সিইসি টরন্টোতে পৌঁছালেও ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নেই। এই দুই দিনে তিনি মূলত নায়াগ্রা ফলসসহ অন্টারিওর কয়েকটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করবেন বলে জানা গেছে। ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি বাংলাদেশের কনস্যুলেট পরিদর্শন করবেন। সেদিনই টরন্টোয় ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি প্রদানের ‘উদ্বোধনী’ অনুষ্ঠান এবং প্রবাসী বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় আয়োজন রয়েছে।

অটোয়া অংশ: ৯–১১ সেপ্টেম্বর
৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সিইসি অটোয়া পৌঁছে হোটেলে লাঞ্চ ও বিশ্রাম নেবেন। রাতেই ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের বাসভবনে আয়োজিত ডিনারে অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। পরদিন তিনি হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় অটোয়া হাইকমিশনে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি প্রদানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। এই সময়ের ফাঁকে অটোয়ার কয়েকটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনও তাঁর সূচিতে রয়েছে।

ভ্যাঙ্কুভার অংশ ও দেশে ফেরার পরিকল্পনা
সূচি অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বর সিইসি অটোয়া থেকে ভ্যাঙ্কুভারের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সেখানে চার দিন তাঁর ছেলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সময় কাটিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার পথে রওনা এবং ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গত আগস্টে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে ভোটার হলেও ভোট দিতে না পেরে কানাডায় চলে গেছে—এবারের সফরে অন্তত ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ মিলছে।

কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মিশনের অবস্থা
দীর্ঘ এ সফরে কানাডার নির্বাচন–সম্পর্কিত কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তার সঙ্গে সিইসির আনুষ্ঠানিক বৈঠক নেই বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে অটোয়া হাইকমিশন থেকে কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি; নির্বাচন কমিশন থেকেও এ–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা মিশনে পৌঁছেনি বলে সূত্রের দাবি।

আরেক সূত্র জানায়, কানাডায় বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার নাহিদা সোবহান—যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশ্বস্ত’ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত—গত বছরের আগস্টে অল্প সময়ের মধ্যে অটোয়ায় যোগদান করে নানা বিতর্কের জন্ম দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে বলা হচ্ছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময়ে পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কাজী রাসেল পারভেজ—বর্তমানে কানাডায় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার—তৎকালীন সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে অনুকূলে রাখতে বিভিন্ন তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সহায়তায় ওই সময় সরকারি ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ সম্পাদনকারী কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পদায়ন এবং নিরাপদে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

এক বছরের মাথায় সরকার নাহিদা সোবহানকে জেনেভায় বদলি করলেও, অ্যাগ্রিমো–সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে পদায়নকৃত সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিন এখনও কানাডায় যোগ দিতে পারেননি। সূত্র মতে, কানাডার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আগের হাইকমিশনের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ না থাকায় দ্রুত সম্মতিপত্র আদায়ে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সে কারণে আপাতত কাজী রাসেল পারভেজ ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬০তম অধিবেশন শুরু হলেও নাহিদা সোবহান ‘কাজের মেয়ের ভিসা’–সংক্রান্ত জটিলতায় দায়িত্ব হস্তান্তরের পরও ছুটি নিয়ে টরন্টোয় অবস্থান করছেন—ফলে এত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশের পিআর হিসেবে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিদেশে এনআইডি সেবা: অগ্রগতি ও বিতর্ক
বর্তমানে ১০টি দেশের ১৭টি দূতাবাস/মিশনে এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে—সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও কানাডা। ২০১৯ সালে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদেশে এনআইডি দেওয়ার প্রকল্প শুরু করে এবং ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে প্রবাসীদের জন্য অনলাইন নিবন্ধনের উদ্বোধন হয়। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জুলাই পর্যন্ত নয়টি দেশে ৪৮,০৮০ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন/এনআইডির জন্য আবেদন করেছেন।

তবে কানাডা অধ্যায়ের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। সূত্র বলছে, প্রায় চার মাসে ‘শতাধিক’ স্মার্টকার্ড হাতে থাকা সত্ত্বেও এনআইডি সার্ভারের কারিগরি ত্রুটি ও অনুমোদন–প্রক্রিয়ার ধীরগতি সমাধানে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে মাঠপর্যায়—বিশেষ করে টরন্টো ও অটোয়ায়—সেবাটি ‘টিমেতালে’ চলছে বলেই প্রবাসী মহলে অভিমত।

নীতিগত প্রশ্ন ও জনঅভিমত
অভিজ্ঞজনেরা মনে করছেন, লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে এ প্রকল্প নিয়ে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয়; সফরগুলোর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। যেখানে সরকার জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন—সেখানে গোটা দেশের প্রস্তুতি জোরদার করার বদলে মাত্র একশ’টি এনআইডি কার্ড বিতরণের উছিলায় কর্মকর্তাদের ‘অবকাশযাপন–ধাঁচের’ সফর দৃষ্টিকটু বলেই জনমত গড়ে উঠছে।

সারকথা
একদিকে সিইসির হাতে কানাডায় ‘উদ্বোধনী’ আনুষ্ঠানিকতা ও সীমিত পরিসরে স্মার্টকার্ড বিতরণ; অন্যদিকে মিশন পরিচালনায় অনিশ্চয়তা, নেতৃত্ব পরিবর্তনের জটিলতা, এবং সেবার ধীরগতি—সব মিলিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এনআইডি কার্যক্রমের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সফর শেষে টরন্টো–অটোয়ায় সেবার গতি বাড়াতে বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়—এখন প্রবাসীরা সেটিই দেখতে চান।

 


Back to top button
🌐 Read in Your Language