
টরন্টো শহরে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা ও প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিটি এলাকায় গড়ে উঠছে স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ, যেখানে মিনার আর গম্বুজের নান্দনিক সমন্বয়ে ফুটে উঠেছে মুসলিম সভ্যতার ঐতিহ্য। এই ব্যস্ততম মহানগরীর প্রতিদিনের কোলাহলের মাঝেও কিছু নির্জন মুহূর্ত নীরবে অপেক্ষা করে, যখন একজন মুসলমানের আত্মা খুঁজে পায় তার স্রষ্টার সাথে যোগাযোগের নির্মল সুযোগ।
মসজিদের প্রশান্ত পরিবেশে নামাজিরা খুঁজে পান এক অনন্য প্রশান্তি – যেখানে আঙুলের তাসবিহে গুনে গুনে চলতে থাকে ক্ষমা প্রার্থনা, চোখের জলে ভেজে যায় নামাজির চেহারা, আর কপাল স্পর্শ করে মসজিদের নরম কার্পেটের শীতল স্পর্শ। এই পবিত্র স্থানগুলো হয়ে উঠেছে হৃদয়ের আশ্রয়স্থল, যেখানে প্রতিটি মুসলমান খুঁজে পায় ঈমানের অনুরণন এবং আত্মিক শান্তির অমূল্য ক্ষণ।
প্রার্থনা শুধু শব্দ নয়, প্রার্থনা এক অভিপ্রায়—পাপের ভার লাঘবের, জীবনের ভারসাম্য ফেরানোর, আল্লাহর করুণা লাভের। তাই টরন্টোর মুসলিমরা, নানা জাতিগোষ্ঠী ও ভাষার মানুষ, একটি মহৎ স্বপ্নে একত্র হয়েছিলেন—একটি এমন মসজিদ গড়ে তোলা, যেটি হবে তাদের ঈমান, সংস্কৃতি আর ঐক্যের প্রতীক। সেই ভাবনা থেকেই ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা পায় আল আশরাফি ইসলামিক সেন্টার। এক টুকরো আত্মিক শান্তির ভূমি।
মসজিদের দেয়ালে ছিল খোদার নাম, ভিতরে ছিল ধর্মীয় পাঠ, শিশুদের মুখে ছিল তেলাওয়াতের সুর, আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধরা আল্লাহর পথে ফেরার আলোচনা করতেন। অথচ সেই পবিত্র মাটিতেই জমে উঠেছিল অজানা এক অন্ধকার। ইবাদতের ছায়ায় ক্রমশ গড়ে উঠছিল প্রতারণার এক নীরব সাম্রাজ্য—যেখানে আল্লাহর নামে তোলা দানের অর্থ বয়ে যাচ্ছিল বিলাসিতার পথে।
কিন্তু কেউ জানত না, এই পবিত্র মসজিদেরই কোণে কোণে কেউ কেউ বুনছিলেন বিশ্বাসঘাতকতার জাল। নামাজিরা যখন সিজদায় মগ্ন, তখন অফিসের বদ্ধ দরজার আড়ালে চলছিল হিসাবের জালিয়াতি। আর সমস্ত প্রমাণ চাপা পড়ে থাকত সেখানে – যেখানে সাধারণ মুসল্লিদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। এক পবিত্র বিশ্বাসের অবমাননার কাহিনি, আল আশরাফি ইসলামিক সেন্টার মসজিদের আর্থিক কেলেঙ্কারি (২০১৯-২০২৪) যা মুসলিম সম্প্রদায়ের আস্থাকে করেছিল ধূলিসাৎ।
এই গল্প কেবল একটি মসজিদের নয়—এ এক বিশ্বাসের পতনের দলিল, যেখানে ধর্মের পোশাকে ছদ্মবেশী এক জীবনযাত্রার পর্দা ফাঁস হয়ে গেছে।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠা ২০০৬ সালে। একটি বৃহৎ মসজিদ, যার ভেতরে ১৫০০ জন মুসল্লির জায়গা, রয়েছে নারী প্রার্থনা কক্ষ, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, এবং সামাজিক মিলনকেন্দ্র। কিন্তু যে স্থাপনাকে ঘিরে প্রার্থনা, শিক্ষা আর সম্প্রীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ধীরে ধীরে জমতে থাকে অর্থনৈতিক অনিয়মের ছায়া।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের জুনে, যখন একজন প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ দেখতে পান, মসজিদের বিল্ডিং ফান্ড হিসেবে ঘোষিত দুই লক্ষ তহবিল থেকে ৮০,০০০ ডলার মাত্র অবশিষ্ট। কেবল এটুকু নয়, ২০২০ সালে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জানায় তাদের পাওনা ২১০,০০০ ডলার মসজিদ কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করেনি।
কিন্তু ততদিনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে—মসজিদের প্রধান ইমামের নাম। তিনি একাধারে ছিলেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রধান, যার মাসিক বেতন ছিল প্রায় $১০,০০০ ডলার। ২০২১ সালে দেখা যায়, মসজিদের পার্কিং লটে তিনি নতুন Lexus RX 350 গাড়ি নিয়ে আসেন। ইমামের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, নগরীর অভিজাত এলাকায় মাসিক $৬,২০০ ডলারের ভাড়ার বাড়ি, এবং তার আত্মীয়স্বজনকে যুক্তিহীন উচ্চ বেতনে মসজিদে চাকরি দেওয়া—এসব তথ্য জনমনে প্রশ্ন তোলে।
রমজানে ৩০,০০০ ডলারের ইফতার প্যাকেট বিতরণের নামে মাত্র ৫০০টি বিতরণ হয়েছে—এমন অভিযোগও সামনে আসে। “ইফতার প্যাকেট কোথায় গেল?”—এই প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায় ফেসবুক থেকে Reddit-এর থ্রেডে। এক অভ্যন্তরীণ ইমেইলে দেখা যায়, ইমাম তার ভাগ্নেকে $৪৫,০০০ ডলারে ইভেন্ট কোঅর্ডিনেটর পদে নিয়োগ দেন। ২০২০ সালে ইমামের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে হঠাৎ $১৫০,০০০ ডলার জমা পড়ে—যা তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে মিল ছিল না।
তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ গড়ায় আদালতে। আদালত ২০২৩ সালের মার্চে আদেশ দেন Construction Company-কে $২৩৫,০০০ ডলার ফেরত দিতে হবে। এদিকে Ontario Provincial Police-এর Financial Crimes Unit শুরু করে তদন্ত। কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির (CRA) আর্থিক প্রতিবেদনে ধরা পড়ে ১২টি ভুয়া ভেন্ডর ইনভয়েস ও একটি গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে $৪২০,০০০ ডলারের সন্দেহজনক লেনদেন। এসব তথ্যের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয় মসজিদের চ্যারিটি রেজিস্ট্রেশন।
সৃষ্টি হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্থানীয় মুসল্লিরা প্রতিবাদ করেন, দান বন্ধ করে দেন। ২০২৪ সালের মে মাসে একটি গোপন ভোটে দেখা যায়—৬৮% সদস্য চান ইমাম অপসারিত হোক, ২২% চান বর্তমান কমিটি থাকুক, আর ১০% থাকেন নিরপেক্ষ।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গঠিত নতুন কমিটি প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টেন্টকে দিয়ে অডিট করায় এবং ত্রৈমাসিক আর্থিক রিপোর্ট প্রকাশ শুরু করে। ক্যাশ লেনদেন বন্ধ করে কেবল ডিজিটাল দানের দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায় না এতো সহজে—২০২৪ সালের রমজানে দানের পরিমাণ ছিল $৩৫০,০০০ ডলার, যেখানে ২০২২ সালে ছিল $৭০০,০০০ ডলার।
ধর্ম হলো সবচেয়ে পবিত্র আশ্রয়, যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির জন্য যায়। আর মসজিদ—তা তো হওয়ার কথা ছিল আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্র। কিন্তু যখন সেই আশ্রয়ে বিশ্বাসঘাতকতা বাসা বাঁধে, তখন মানুষ পথ হারায়। ইমাম যদি ঈমানের নামে প্রতারণা করেন, যদি প্রার্থনার অজুহাতে লুকিয়ে রাখেন হিসেবের খাতা—তবে প্রশ্ন ওঠে, ধর্ম কার জন্য?
এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু প্রার্থনাই নয়—দায়িত্ব, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাও ধর্মীয় অনুশাসনের অংশ। মসজিদ কেবল চার দেওয়ালের ইমারত নয়, তা বিশ্বাসের প্রতীক। সেই বিশ্বাস রক্ষায় দরকার ঈমানদার নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, আর সাহসী জনসাধারণ, যারা সত্য প্রকাশে পিছপা হয় না।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কানাডার অনেক মসজিদ এখন বাধ্যতামূলক অডিট, তিন সদস্যবিশিষ্ট ফাইন্যান্স কমিটি এবং স্বচ্ছ দান ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। কারণ, বিশ্বাস যদি হারিয়ে যায়—তবে দামী মার্বেল পাথরের সৌন্দর্যও অর্থহীন।
দায়িত্বশীল স্বীকৃতি:
এই প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিবেদন ও আদালতের নথিপত্রে উল্লিখিত ঘটনার ছায়া অনুসরণ করে। তবে বৃহত্তর স্বার্থে—বিশেষত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা রক্ষা এবং সাধারণ মুসল্লিদের বিশ্বাসে আঘাত না দিতে এটি কল্পনানির্ভর রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।
‘আল আশরাফি ইসলামিক সেন্টার’ নামের কোনও মসজিদ বা প্রতিষ্ঠান বাস্তবে টরন্টোতে নেই। এটি একটি রূপক, যার মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।









