সম্পাদকের পাতা

মাত্র দশ মিনিট!

নজরুল মিন্টো

সময় ঠিক কখন থামে তা কেউ বলতে পারে না। সময় কখনও নদীর মতো বয়ে যায়, কখনও পাহাড়ের মতো স্থির। কখনো তা হাতে গোনা যায়, আবার কখনো গলে পড়ে ফোঁটার মতো, বোঝার আগেই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো সময়ের বুক চিরে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ১২ জুন, দুপুর ১২টা ২০ মিনিট। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একজন তরুণী বুঝলেন—সময় থেমে যেতে পারে। কখনো কখনো মাত্র দশ মিনিটই পারে জীবনের মানচিত্র বদলে দিতে। তার নাম ভূমি চৌহান। বয়স ২৮। জন্ম ও বড় হওয়া ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই তরুণী এসেছিলেন গুজরাটের ভরুচে, মায়ের আঁচল, বাবার আঙ্গুল আর ছোট ভাইয়ের কান্নামাখা আদরের ডাকে সাড়া দিতে।

ভূমি জানতেন, ছুটি ফুরিয়ে আসছে। আগামিকাল লন্ডনে ফিরতে হবে। ১১ জুন রাতে তিনি অনলাইনে চেক-ইন সেরে ফেলেছিলেন। আসন—36G। ব্যাগ গোছানো, পাসপোর্ট তৈরি, জুতা পালিশ করা, মনকে শক্ত করে ফেয়ারওয়েল নিতে প্রস্তুত। সকাল ৯টায় পরিবার তাঁকে গাড়িতে তুলে দেয়। গাড়ি ছুটে চলেছে আহমেদাবাদের দিকে। গন্তব্য এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট AI-171।

কিন্তু সময় নিজে যখন গন্তব্য বদলায়, তখন কোনো মানচিত্র কাজ করে না। সদার প্যাটেল রিং রোডে হঠাৎ করে একটি নির্মাণাধীন ওভারব্রিজের কাছে গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। যেন এক অদৃশ্য হাত পথ আটকে দেয়। সামনে ট্রাক, পাশে বাইক, মাঝে অটোরিকশা—আর মানুষের অস্থির হুমড়ি খাওয়া হালচাল। ভূমি বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকান। ১১টা ২০… ১১টা ৪৫… ১২টা। বুকের ভেতরে শ্বাস আটকে আসে। ১২টা ২০ মিনিটে গাড়ি ঢোকে বিমানবন্দরের চত্বরে। তিনি দৌড়ে পৌঁছান গেট পর্যন্ত। কিন্তু ততক্ষণে গেট বন্ধ।

বোর্ডিং শেষ। কর্মীরা চোখ নিচু করে বলেন, “ম্যাডাম, বোর্ডিং ক্লোজ হয়ে গেছে।” যেন একটি অদৃশ্য দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল তার সামনে। হতাশ, আহত, হৃদয়ভাঙ্গা ভূমি ট্যাক্সির দিকে ফিরে যান। ফোন করেন ট্রাভেল এজেন্টকে। রিফান্ডের কথা বলেন। রিপ্লেসমেন্ট ফ্লাইটের খোঁজ করেন। আকাশ তখন ভারী। বাতাসে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। আর ঠিক সেই সময়, ফোনে একের পর এক মেসেজ। “ভূমি, তুমি প্লেনে উঠেছিলে?” “ঈশ্বর তোমায় রক্ষা করুন।” “দ্রুত খবর দেখো!”

একটা ভিডিও আসে—কালো ধোঁয়া, দাউ দাউ আগুন, আর্তনাদ। তারপর নিশ্চিত হওয়া যায়, AI-171 বিমানটি উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডের মাথায় বিধ্বস্ত হয়েছে। একটি আবাসিক এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। ধ্বংসস্তূপ। ধোঁয়ার ধাক্কায় কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। ২৪১ জন যাত্রী ও ক্রু মুহূর্তে মারা যান। মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও রক্ষা পাননি। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই, আশার আলো নিভে যায় নিঃশব্দে। ভূমি স্তব্ধ হয়ে পড়েন। ঠান্ডা মেঝেতে বসে পড়েন। তার চোখে জল নেই, ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই—শুধু বুকের ভেতর এক অচেনা কান্নার গর্জন। “দশ মিনিট… যদি আমি মাত্র দশ মিনিট আগে পৌঁছাতাম… আমি তো এই মূহূর্তে…!” —এই চিন্তাই তাকে অবশ করে ফেলে।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার পুরো শরীর কাঁপছিল। আমি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে আমি বেঁচে আছি। আমার ঈশ্বর… তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন।”

তার বেঁচে যাওয়াকে কেউ বললেন ভাগ্য, কেউ বললেন অলৌকিকতা। কিন্তু ভূমির কাছে এটা ছিল এক ঈশ্বরীয় হস্তক্ষেপ। একটি বার্তা। একটি দায়িত্ব। এক বিস্ময়ের জন্ম। পরিবার যাকে বিদায় দিয়েছিল হাসিমুখে, তারা সেই ভূমিকে আবার ফিরে পেয়ে চোখের জলে ভিজে যায়। পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে বলেন, “তুমি ঈশ্বরের কৃপায় রক্ষা পেয়েছ।” সংবাদপত্রে তাকে বলা হয় “The Luckiest Woman Alive.” কেউ কেউ বলেন, “ভাগ্যের নতুন ব্যাখ্যা।”

কিন্তু ভূমি আলোচনার কেন্দ্রে নিজেকে হারাননি। বিপরীত দিকে হাঁটেন। ১৪ জুন, দুর্ঘটনার দুই দিন পর, তিনি চুপিচুপি যান সেই দুর্ঘটনাস্থলে। যেখানে এখনো পোড়া ধাতবের গন্ধ, দগ্ধ ভবনের কংক্রিট, মানুষের কান্নার ছায়া। ভূমি সেখানে আগরবাতি জ্বালালেন। প্রার্থনা করলেন। কাঁদলেন। বললেন, “আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু যারা পারলেন না—তাদের জন্য আমি কিছু করতে চাই।”

এই সংকল্প থেকেই তিনি যুক্ত হন একটি এনজিও-তে, যারা মানসিক ট্রমায় ভোগা মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ভূমি নিজেই এখন অন্যদের বাঁচানোর দায়িত্ব নিচ্ছেন। একইসঙ্গে, তিনি একটি বিমান নিরাপত্তা সচেতনতা কর্মসূচি চালু করার চিন্তা করছেন। প্রতিটি দিনে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে তিনি অনুভব করেন, তিনি কিভাবে বেঁচে আছেন।

ভূমি বলেন, “জীবনকে আমি আগে বছরে মাপতাম। এখন বুঝি, তা মাপা যায় মুহূর্তে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সময় ছিল ওই দশ মিনিট। সেই দশ মিনিটই আমাকে জীবন দিল। সেই দশ মিনিটই এখন আমার পাথেয়।”

এই হলো ভূমি চৌহানের গল্প। একজন তরুণীর গল্প, যে দশ মিনিট দেরি করে ফ্লাইট মিস করেছিল—আর বেঁচে গিয়েছিল। যে নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করেছে অন্যদের জন্য, নিজের অলৌকিক বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেতে। কখনো কখনো দেরি করাও হতে পারে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ উপহার।


Back to top button
🌐 Read in Your Language