
রুমমেট—শব্দটির শাব্দিক অর্থ, একই কক্ষে বসবাসকারী অনাত্মীয় ব্যক্তি। অনাত্মীয় বললাম এ কারণে যে, ভাই-বোন, চাচা, মামা কেউ সঙ্গে থাকলে আমরা সাধারণত রুমমেট বলি না। তখন সরাসরি সম্পর্কের পরিচয় দিই। প্রবাসে বসবাসকারী অধিকাংশ বাঙালি কোনো না কোনো সময় রুমমেট নিয়ে থেকেছেন। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা! কারো জন্য এখনো দুঃস্বপ্ন।
কামাল নামে টরন্টোতে আমার পরিচিত একজন ছিল যে প্রতি দু’মাস অন্তর ঘর বদলায়। এ পর্যন্ত কোনো রুমমেটের সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি। দেখা হলেই তার কাছ থেকে শুনি রুমমেটের যন্ত্রণার কাহিনী।
সর্বশেষ সে ঘর বদলাবার কারণ হিসেবে বললো টেলিফোন। দিন নেই, রাত নেই তার রুমমেট টেলিফোন নিয়ে থাকে। রান্নাবান্না করে না। যেদিন তার রান্না সেদিন তার অ্যাপয়েনমেন্ট থাকে। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এর আগে কামালের আরেক রুমমেট তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ফেলে তাকে না জানিয়েই। এখন পর্যন্ত তার মনের মতো রুমমেট সে পায়নি।
শুধু কামালই নয়। এরকম বহু কামাল এই টরন্টোতে আছেন। ধৈর্যের এক অঘোষিত পরীক্ষা দিতে দিতে তারা ক্লান্ত।
একবার একটা ঘটনা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। তারা দু’জন একই সঙ্গে কানাডায় এসেছিলো। একজনের নাম বশির, আরেকজন রফিক।
টরন্টো ডাউনটাউনে একটি বাসা নিয়ে দুজনে থাকতো। এমনিতে তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল, কিন্তু বনিবনা ছিল না একটি বিষয়ে। দেশে কে কতজনকে কীভাবে ধোঁকা দিয়ে বুদ্ধ বানিয়ে এসেছে তার একটি প্রতিযোগিতা ছিল তাদের মধ্যে।
কেউ পাঁচজনকে ধোকা দিলে আরেকজন বলতেন আটজনকে সে ঘোল খাইয়েছে। একজনের কথা আরেকজন বিশ্বাস করতে চাইতো না। ধীরে ধীরে তারা একে অপরকে ‘চাপাবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এই ভাবনাই চারপাশে প্রচার করতে থাকে।
দু’জনের আরেক জায়গায় মিল ছিল। তাহলো তারা ছিলো অসাধারণ কৃপণ। ‘কঞ্জুস দ্য গ্রেট’ যাকে বলা চলে। যেমন খাওয়া-দাওয়ায়, তেমন চালচলনে।
একদিন গ্যারেজ সেল থেকে রফিক একটা টেলিভিশন কিনে আনলো। কিন্তু বশির যেন এ টেলিভিশন না দেখতে পারে, এবং না ধরে সেজন্য সে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিলো।
মাঝে মধ্যে বশির একা ঘরে থাকলে অনিচ্ছায় হোক আর জেদে হোক এটা চালাতো। আর রফিক ঘরে এসে এ নিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিতো। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন ঘরে ঢুকে তার প্রথম কাজ ছিল টেলিভিশনে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করা। অর্থাৎ টেলিভিশন চলেছে কি চলে নাই রেগুলার চেকআপ। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম অবস্থায় গিয়ে পৌঁছে। কিন্তু কেউ রুম ছেড়ে যায় না।
ধৈর্য পরীক্ষায় অধৈর্য হয়ে একদিন বশির একটা পরিকল্পনা করলো। সে কিচেনের ফ্লোরে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে ৯১১-এ ফোন করে। ফায়ার ব্রিগেড আসে। বাড়ির মালিক আসে। রফিক তখন তাদের বলেন, এটা মনে হয় বশিরের কাজ।
ব্যাস! বশির একটা সূত্র খুঁজে পেলো। সে বললো এ দুষমনের সঙ্গে আর এক ঘরে থাকা যায় না। বলেই তার বিছানাপত্র নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
ঘটনাটা বশিরের মুখ থেকেই শোনা। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এত বড় ঘটনা ঘটাতে গেলেন কেন? সে বললো, এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। হাবিয়া দোজখে বাস করছিলাম ভাই।
এবার আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। ৮০’র দশকের কথা। সারজাহতে আরবিদের একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ছোট্ট একটা রুমে থাকতাম। বাড়িটিতে বেশ কয়েকটি রুম ছিলো।
আমার রুমটা এত ছোট ছিল যে, একটা খাট ফেললে ওঘরে আর কিছু রাখার কথা কেউ চিন্তা করতো পারতো না।
তারপরও সে রুমে ছিল টিভি, ফ্রিজ, ডেকসেট, হারমোনিয়াম, তবলা, বইপত্র, জুতা, কাপড় সব। এত জিনিসে ঠাসা অবস্থায় সেখানে ছুটির দিনগুলোতে ৭-৮ জনও ঘুমিয়েছি।
নিখিল। খুবই মাই ডিয়ার একজন মানুষ। একসময় সে ঘর বদলাবে শুনে আমি প্রস্তাব দিলাম আমার ঘরে চলে আসতে। সে সানন্দে রাজি হয়ে যায়।
আমার বন্ধু-বান্ধব কেউ কেউ ব্যাপারটা ভালোভাবে নিল না। তারা বললো নিখিল মস্ত বড় সেয়ানা একটা লোক। তার সঙ্গে কারো বনিবনা হয় না।
কেউ ভবিষ্যৎবাণী করলো, কেউ আমাকে সময়ও বেঁধে দিল যে, এক মাসের ভেতর আমাদের দুজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে।
নিখিলকে রুমমেট হিসেবে আনার পেছনে আমার অনেক যুক্তি ছিল। প্রথমত, নিখিল শিক্ষিত। তার মধ্যে রসবোধ আছে। বিভিন্ন বিষয়ে সে জ্ঞান রাখে প্রচুর।
দ্বিতীয়ত, আমি ছিলাম ঘুমকাতুরে। এককিলো ওজনের ঘড়ির অ্যালার্মও আমার ঘুম ভাঙতে পারে না। নিখিল খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে এবং আমাকে জাগাবে।
তৃতীয়ত, অর্থাৎ আসল বিষয়টি হলো নিখিল রাঁধতে পারে এবং চুলা থেকে শুরু করে তার রান্নার সরঞ্জামাদি সবই আছে। এখন থেকে ঘরের রান্না খাবো।
এছাড়া আরেকটা জিনিস তার সঙ্গে আমার মিল যে, আমি যাকে দেখতে পারি না, সেও তাকে দেখতে পারে না।এরপরে কি আর কোনো কথা থাকে? সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন দু’জনের মধ্যে লেগে যায়।
আমাদের ঘরের সবকিছুতে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার ছাপ পড়লো। নিয়ম মতো খাওয়া, সময়মতো ঘুমানো; এমনকি আড্ডাধারী লোকজনের আনাগোনাও কমে গেলো। নিখিল কথাবার্তা কারো মুখের দিকে চেয়ে বলতো না। যা বলার সোজা বলে দিত।
যেমন কেউ জুতো পরে ঘরে ঢুকলে নিখিল বলতো ভাই সাহেব, এই জায়গাটাতে আমি ঘুমাই। দয়া করে আপনার জুতো জোড়া বাইরে রেখে আসুন। ধরুন, কেউ এসে গল্প জুড়ে দিল। তৎক্ষণাৎ নিখিল উপর্যপুরি হাই তোলা শুরু করলো। এমন একটা ভাব যে, সে এখনই ঘুমের ঘোরে মাটিতে ঢলে পড়বে। অতএব গল্পকারকে ভাগতে হতো তাড়াতাড়ি।
মাঝেমধ্যে অতিরঞ্জিত করে ফেলে। বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতাম এমন করছো কেন? বলতো- ‘এসব ফাটা গল্প শুনতে তোমার ভালো লাগতে পারে, আমার লাগে না। এ সময় একটি বই পড়লেও জ্ঞান বাড়বে।’ যুক্তি বটে!
তার যুক্তির সাথে পেরে ওঠা কঠিন। ভীষণ একরোখা। একদিন বলেছিলাম প্রতিদিন রান্নার কি দরকার! একবারে দুইতিনদিনের রান্না করে ফ্রিজে ভরে রাখলে কি হয়! তার উত্তর-’বাসি খাদ্য খাওয়ার জন্য দুবাই আসি নাই’। এভাবেই দিন যাচ্ছিল…।
একদিন আমার অফিসে এক বাঙালি ছেলে এসে আমার এক বন্ধুর রেফারেন্স দিয়ে বললো, তিনি তাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে। নাম হাসেম। ছেলেটার বেশভূষা কথাবার্তা দেখে মনে হলো ভালো ঘরের ছেলে। সে পরিচয়ও দিল তাই। আমি তাকে আমাদের ঘরে নিয়ে এলাম।
নিখিল কাজ থেকে এসেই তার ইন্টারভিউ শুরু করে দিল। -আপনার নাম? লেখাপড়া? ছেলেটা বললো-বিএ পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। -আচ্ছা বলুন তো, ‘আমি পৌঁছবার আগে আমার বস অফিসে চলে গেছেন এটার ইংরেজি কি?’প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
আমি এক ফাঁকে বাইরে নিয়ে গিয়ে নিখিলকে বললাম কী শুরু করেছো? ফিস ফিস করে বললো-আমার সন্দেহ জাগছে ছেলেটা ম্যাট্রিক পাশ করেছে কী না!
কিছু একটা ধরতে পারার আনন্দে খুব উত্তেজিত। যেন একটা বিরাট কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে।
আমি বললাম, সে ম্যাট্রিক পাস, না এমএ পাস তা দিয়ে আমাদের কী দরকার? নিখিল বললো, তোমার কী আত্মীয় হয়?
আমি বললাম-না।
-আমার তো মনে হয় সে এখানে থাকবে। নিখিল সন্দেহ প্রকাশ করলো।
আমি বললাম -এ প্রশ্ন কেন উঠছে?
-তার উদ্দেশ সুবিধের না, লেট মি হ্যান্ডেল ইট-বলে নিখিল ভেতরে চলে গেলো।
রাতে খাওয়ার পর নিখিল কোনো ভনিতা ছাড়াই বললো, দেখেন হাসেম সাহেব কথাবার্তা একটু পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। আপনি বলছেন, আপনি একজন বড়লোকের ছেলে। আমরা মানলাম।
এখন ভাই এখানে যদি থাকেন, যে কয়দিন থাকবেন আপনাকে ভাড়া দিতে হবে, খাওয়া-দাওয়া করলে তার ভাগও আপনি দেবেন।
হাসেম এককথায় রাজি হয়ে গেলো। নিখিলের পরিকল্পনা ছিল এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে হাসেম বলবে যে, না, সে এখানে থাকতে আসেনি, কিংবা এ ছোট্ট ঘরে জায়গা হবে না। কিন্তু ঝটপট রাজি হয়ে যাওয়ায় নিখিল হেরে গেলো।
প্রতিদিনই নিখিলের সঙ্গে হাসেমের খটমট লেগে যেতো। কোনো কথা সোজা করে তারা কেউই বলতো না। টিভিতে কুস্তি দেখালে হাসেম চলে যেতো ভিলেনের পক্ষে। ভিলেন যখন ভালো লোকটিকে মারতো তখন হাসেম মার মার বলে খুব উত্তেজিত হয়ে যেতো। নিখিল টেনে টুনে তাকে বসাতো।
হাসেম নিম্নমানের হিন্দি ছবি চারটা-পাঁচটা একসাথে নিয়ে আসতো আর একটার পর একটা লাগিয়ে দেখতে থাকতো, যেটা নিখিল একদম পছন্দ করতো না। এদিক হাসেম বাথরুমে ঢুকলে বেরুতে চাইতো না। বাড়ির কে অফিসে যাবে, কে দোকানে যাবে সে এগুলো কেয়ার করতো না।
এ নিয়ে অন্যান্য ঘরের লোকজন অভিযোগ করা শুরু করলে সে তাদের বলে দিয়েছে যে, সেও ভাড়া দিয়ে এখানে থাকে। সে আরও কঠিন করে সকলকে জানিয়ে দেয় যে কারো এত জরুরি থাকলে আগের রাতে যেন গোসলের কাজটি সেরে নেয়।
আমার ওপর বাড়ির সবাই খ্যাপা। তাদের কথা হলো এই জিনিস আমি কোত্থেকে আমদানি করলাম। সপ্তাহ দুই পর একদিন অফিস থেকে এসে দেখি চুলা ভাঙা, হাঁড়ি-পাতিল সব এদিক-ওদিক ছিটানো। একটা বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। নিখিলকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? সে রাগে কাঁপছিলো। বললো আমি আর তোমার সঙ্গে থাকছি না। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কেন?
ঘটনা যা বর্ণনা শুনলাম তা হলো, নিখিল কাজ থেকে এসে চুলা জ্বালিয়েছে। বাসনপত্র ধুয়ে চাল বসিয়েছে। পেঁয়াজ কাটা থেকে শুরু করে সব করছিলো। এদিকে হাসেম সকাল থেকে ঘরে বসে আছে। একটা জিনিসও ধরেনি, ধরার গরজও অনুভব করেনি। উল্টো কিছুক্ষণ পরপর জিজ্ঞেস করে-দাদা, আর কদ্দুর! নিখিল বহুভাবে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কিন্তু হাসেম ভ্রূক্ষেপও করছিলো না।
নিখিল রান্না করতে করতে বিড়বিড় করে বলছিলো- সে দুবাই আসার আগে সিলেটে এক রেস্টুরেন্টের কুক ছিল তাই এখানেও এসে সে কুকের কাজ করে। সেটা শুনে হাসেম বলে, তাই তো আপনার রান্না এত মজা। নিখিল দাঁত কিড়মিড় করে গলার স্বর একমাত্রা বাড়িয়ে বলেছে তার বাবাও রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। হাসেম দৈনিক খালিজ টাইমসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে, এটা তো তাহলে আপনার বংশগত পেশা। ব্যস! নিখিল কেরোসিনের চুলা তুলে দিলো এক আছাড়। যা আছে সব এদিক-ওদিক ছুঁড়ে ফেললো।
মিটিংয়ে বসলাম। হাসেমকে বললাম, ভাই তোমাকে নিয়ে তো আর থাকা যাবে না। কারণ, তোমার কারণে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হাসেম উত্তর দিল, ‘বললে হবে নাকি? আমাকে ঘর পেতে হবে তো! আমি কী যেখানে সেখানে, যার তার সঙ্গে গিয়ে থাকবো নাকি?’
নিখিল মুখ ঢেকে শুয়েছিল, চাদরটি সরিয়ে বললো-’লও, এখন ঠ্যালা সামলাও’।









