শরীর চর্চা

ক্যান্সার, খাবার-দাবার ও হোমিওপ্যাথি

ক্যান্সার চিকিৎসায় অনকোলজি স্ট্রিট প্রোগ্রাম অনেকটা গল্পের মতো। আমেরিকার ফিলাভেলফিয়ার শিশু হাসপাতাল সংলগ্ন একটি বিশেষ চিকিৎসা স্থানের নাম ড়হপড়ষড়মু ংঃৎববঃ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের জন্য এ ব্যবস্থা। এ কি কোনো সাধারণ চিকিৎসালয় নয়। এটিকে সাজানো হয়েছে শিশুদের বিনোদন পার্কের মতো। এখানে রয়েছে নানা ধরনের খেলনা, একুরিয়াম ও খেলাধুলার অন্যান্য উপকরণ। ১৯৭০ সালে এর যাত্রা। এ ড়হপড়ষড়মু ংঃৎববঃ প্রোগ্রাম ৬০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু আরোগ্য লাভের কথা জানা যায়। বলা যায়, প্রথাগত চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তি উন্নয়নের কাজটি করা হয় এখানে। ফলে শিশু রোগীর আরোগ্য হয় তাড়াতাড়ি। ক্যান্সার রোগী আরোগ্য হয় কিনা এ ব্যাপারে নানা ধরনের অভিমত প্রচলিত। আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের পরিচালক (১৯৮০) ডা. ভিনসেন্ট (উজ. ঠরহপবহঃ উবারভধ) বলেছেন, ঈধহপবৎ রহ ড়হব ড়ভ ঃযব সড়ংঃ পঁৎধনষব পযৎড়হরপ ফরংপধংবং রহ যরং পড়ঁহঃৎু ঃড়ফধু (ভরমযঃরহম পধহপবৎ, চ-১)। ক্যান্সার আরোগ্য সম্পর্কে আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের ভাষ্য হচ্ছে ঋরাব ুবধৎ ংঁৎারধষ ঃযব ঢ়বৎরড়ফ ধভঃবৎ ফরধমহড়ুরং যিবহ রভ ঃযব ঢ়ধঃরবহঃ রং শবঢ়ঃ ভৎবব ভৎড়স ংুসঢ়ঃড়সং, সড়ংঃ ঃুঢ়বং ড়ভ পধহপবৎং ধৎব পড়হংরফবৎবফ পঁৎবফ (ভরমযঃরহম পধহপবৎ). ক্যান্সার চিকিৎসার অগ্রগতিতে ক্যান্সার ইমিউনোলজি বা ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধ বিজ্ঞান এখন দ্রুত বিকাশমান একটি বিষয়। ১৯৪৭ সালে অগ্রযাত্রা শুরু বিজ্ঞানী বার্নেটের প্রবক্তা। বর্তমানে ‘বিসিজি ইমিউনোথেরাপি’ বেশ জনপ্রিয়। তারপরও এ চিকিৎসার জটিলতা নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। ইমিউনোথেরাপির ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার হুশিয়ারিও রয়েছে কোনো কোনো বিজ্ঞানীর পক্ষ থেকে। ক্যান্সার চিকিৎসায় চিকিৎসকের প্রথম কাজ হচ্ছে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা। এ জন্য ক্যান্সারের ধরন ও প্রকৃতি, স্থান ও উৎপত্তি এবং বিস্তৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান তার পথপ্রদর্শক। ক্যান্সারের ধরন ও প্রকৃতি অর্থাৎ এটি কি কারসিনোমা না সারকোম, লিম্ফোমানা মহিলোমা অথবা লিউকেমিয়া_ এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। এ পাঁচ ধরনের ক্যান্সারের অন্তর্গত আরো প্রায় একশ রকমের ক্যান্সার পরিচিতি রয়েছে। অঙ্গভিত্তিক এসব ক্যান্সারের নামকরণ রয়েছে। যেমন হেপাটোমা বললে আমরা বুঝি লিভারের ক্যান্সার। আবার কোনো কোনো ক্যান্সার আবিষ্কার কর্তার নামানুসারে প্রচলিত, যেমন উইলমস টিউমার, জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স উইলসের নামানুসারে যা তিনি ১৮৯৯ সালে আবিষ্কার করেন। আবার হজকিনস লিম্ফোমা ইংরেজ প্যাথলজিস্ট থমাস হজকিনের নামানুসারে যা তিনি ১৮৩২ সালে আবিষ্কার করেন। ক্যান্সার চিকিৎসার সফলতা নির্ভর করে কত তাড়াতাড়ি অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে তা চিহ্নিত হয়েছে কিনা তার ওপর। জন হপকিনসের সর্বশেষ তথ্য মতে (ঔড়যহ ঐঢ়শরহং টঢ়ফধঃব) প্রত্যেক মানুষের শরীরে ক্যান্সার কোষ বিদ্যমান। এ কোষ যখন কোটি কোটি কোষে পরিণত হয় তখন তা পরীক্ষাগারে ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত হয়। আবার যখন চিকিৎসায় ক্যান্সার আরোগ্য হয়েছে বলা হয়, তখন পরীক্ষাগারে ধরার মতো ক্যান্সার কোষ বিদ্যমান নেই বলে বিবেচনা করা হয়। অথচ তখনো ক্যান্সার কোষ শরীরে বিদ্যমান। এভাবে ক্যান্সার কোষ কোনো ব্যক্তির শরীরে জীবনে ছয় থেকে ১০ বার পর্যন্ত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে এবং শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। একজন মানুষের শরীরে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধির পেছনে যেসব কারণ দায়ী তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে পুষ্টি অবস্থা। বংশগত প্রভাব, পরিবেশ, খাবার-দাবার এবং জীবনযাত্রার প্রভাব ও ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। ক্যান্সার প্রতিরোধে খাদ্যাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ দিনে অন্তত পাঁচ ধরনের ফলফলাদি বা শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য। ভিটামিন সি ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমেরিকার নোবেল বিজয়ী রসায়নবিদ লিনাস পলিং (খরহঁং চধঁষরহম), ধ ঈযধসঢ়রড়হ ড়ভ ঃযব সবফরপরহধষ াধষঁব ড়ভ ারঃধসরহ ঈ গবেষণাটি চিকিৎসা বিজ্ঞান জগতে বেশ সমাদৃত। এ ধরনের বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, ভিটামিন সি মুখ, অন্ননালি, অন্দ্র, পাকস্থলী, পায়ুপথ ও জরায়ুর মুখে ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে। আবার উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার স্তন, অন্ত্র ও প্রোস্টেস ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। তাই উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার অধিক গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। আচার, কাসুন্দি, শুঁটকি ও লবণ দেয়া মাছ অন্ননালি ও পাকস্থলীর ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। ধূমপান থেকে বিরত থাকলে ফুসফুসসহ অন্যান্য অনেক ক্যান্সার থেকে বেঁচে যাওয়া যায়। পান, জর্দা, তামাক, মুখ, মাড়ি, গলনালির ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। মদপানে বিরত থাকলে লিভার ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে না। এভাবে দেখা যাচ্ছে জাপানিদের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যান্সার বেশি। কারণ তারা লবণাক্ত এবং আগুনে ঝলসানো মাছ, আচার ও সস জাতীয় খাবার বেশি গ্রহণ করে। অন্যদিকে জাপানিদের মধ্যে অন্ত্রিক ক্যান্সার কম, কারণ তারা চর্বি জাতীয় খাবার কম খায়। ক্যান্সার ও পুষ্টি সম্পর্ক বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আগ্রহী পাঠকরা পড়তে পারেন পধহপবৎ ধহফ ঘঁঃৎরঃরড়হ, পযধৎঃবং ই ংরসড়হব, গউ বইটি। ক্যান্সার চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি : হোমিওপ্যাথি একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। বিশ্বব্যাপী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনি প্রেক্ষাপটে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদেরও ক্যান্সার চিকিৎসায় এগিয়ে আসতে হবে। হোমিওপ্যাথিতে ক্যান্সার চিকিৎসার যতটুকু সুযোগ রয়েছে তা শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এখানে মনে রাখা দরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এখন হোমিওপ্যাথিক স্নাতক কোর্স (বিএইচএমএম) পরিচালিত হচ্ছে। তাই ডিগ্রিপ্রাপ্ত এ ধরনের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব। ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত চিকিৎসকদেরও এ ধরনের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। একদল প্রশিক্ষিত ও দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করতে পারলে হোমিওপ্যাথিতে ক্যান্সার চিকিৎসায় উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে। বর্তমানে আমাদের দেশে যেসব ডাক্তার ক্যান্সার চিকিৎসার কথা বলছেন তাদের অধিকাংশের শিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল দক্ষতার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ শুধু বেশি টাকা নেয়ার মানসিকতায় ক্যান্সার চিকিৎসার প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমরা প্রায়ই অভিযোগ পাচ্ছি, কোনো কোনো চিকিৎসক একসঙ্গে ৫০টি পর্যন্ত ওষুধ দিচ্ছেন ক্যান্সার রোগীকে। কেউ কেউ আবার ১০-২০টি ওষুধ দিচ্ছেন। অথচ এদের অনেকেরই ক্যান্সার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পর্যন্ত নেই। এ ধরনের হাতুড়ে ক্যান্সার চিকিৎসকরা হঠাৎ ধনী হওয়ার মানসিকতায় অনৈতিক এ বাণিজ্য করে যাচ্ছেন, যা সত্যিকার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের জন্য বেশি বিব্রতকর। এ জন্য আমরা যারা ক্যান্সার প্রতিরোধ আন্দোলনে জড়িত, তাদের পক্ষ থেকে রোগী সমাজের কাছে আবেদন, আপনারা চিকিৎসক নির্বাচনে চিকিৎসকের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। যেসব চিকিৎসক চিকিৎসার নামে একাধিক কিংবা ১০-১২টি অথবা ৫০টি ওষুধ রোগীকে দিয়ে থাকেন তারা কোনোভাবেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক নন। তারা হোমিওপ্যাথির নামে জনগণকে প্রতারণা করছেন। তাদের সম্পর্কে রোগী সমাজকে সচেতন হতে হবে।

আডি/ ১৩ নভেম্বর

Back to top button
🌐 Read in Your Language