ঘরের ধুলো থেকে অ্যালার্জি

পরিচ্ছন্ন বাড়িতেও ধুলো অ্যালার্জি সাধারণ ঘটনা বছরব্যাপী মানুষ ভোগে নাক থেকে পানি ঝরায়, চোখ চুলকানি, চোখ থেকে পানি ঝরায়। তার কারন ঘরের ধুলোর জীবাণু। ধুলোর কারনে এ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে কাশি হয়। ধরের ধুলো থেকে এলার্জি হয় কেন ঘরের ধুলো প্রকৃতপক্ষে অনেক জিনিসের মিশ্রণ। এর উপাদানগুলো কম-বেশি হতে পারে এক ঘর থেকে আরেক ঘরের ফার্নিচারের প্রকারভেদ, ঘর তৈরির উপাদানের কারণে, পোষা প্রাণীর উপস্থিতির কারণে, আর্দ্রতার কারণে। ধুলোর মধ্যে থাকতে পারে মানবদেহের ত্বকের মৃত কোষ, প্রাণীর লোম, আনুবীক্ষণিক জীবাণু, তেলাপোকার প্রতঙ্গ, ছত্রাকের জীবাণু, খাদ্য কণা এবং আরো অনেক পরিত্যক্ত ক্ষুদ্র জিনিস। এগুলোর মধ্যে প্রাণীর লোম, তেলাপোকা এবং ধুলো জীবাণু হচ্ছে প্রধান তিন বিপজ্জনক বস্তু। কোনো ব্যক্তি এগুলোর যে কোনোটির কারণে ভুগতে পারেন। এবং তিনি যখন ধুলোর সংস্পর্শে আসেন, তখন অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটে। ধুলোর অ্যালার্জি হলে কি বলা চলে যে এটি একটি নোংরা বাড়ি না নোংরা বাড়ির কারণে অ্যালার্জি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে যদিও। স্বাভাবিক ঘর পরিষ্কারের প্রক্রিয়া ধুলোর অ্যালার্জি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ ধুলোর সব উপাদান এভাবে দূর করা সম্ভব নয়। যেমন আপনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে যত চেষ্টাই করেন না কেন, কার্পেট, মাদুর এবং বালিশ থেকে ধুলোর জীবাণু দূর করতে পারবেন না। বরং এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়তে পারে। ধুলোর জীবাণুগুলো কী কী অতি ক্ষদ্র আনুবীক্ষণিক এ প্রাণীগুলো আটপায়ের অ্যারাকনাইড় পরিবারের অন্তর্গত। অাঁটুলি পোকা এবং চিগার একই পরিবারভুক্ত। এগুলো শক্ত দেহের অধিকারী। এরা ৭০ ভাগ ফারেনহাইট বা তার উচ্চ তাপমাত্রায় ভালোভাবে বাঁচতে পারে। ৭৫-৮০ শতাংশ আর্দ্রতাই এদের পছন্দ। আর্দ্রতা ৪০-৫০ শতাংশের কম হলে এদের বংশ বৃদ্ধি হয় না। শুষ্ক আবহাওয়ায় এদের দেখা যায় না। দেখা গেছে, শতকরা ১০ ভাগ মানুষ এদের কারণে আক্রান্ত হয়। অ্যাজমা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই এদের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ জীবাণুদের দেখ মুখম-লের সংস্পর্শে এলে মানুষের অ্যালার্জি হয়। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বালিশে, মাদুরে, কার্পেটের ভাঁজে এবং আসবাবপত্রের তলায়। ঝাডু দিলে বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার প্রয়োগ করলে এরা বাতাসে ভাসতে থাকে অথবা হেঁটে হেঁটে অন্যপ্রান্তে সরে যায়। অ্যালার্জি রোগীদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে এবং উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি দিনে ৮ ঘণ্টা ঘুমান তার নাক জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় বালিশে বাসা বেঁধে থাকা জীবাণুগুলোর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকে। এক প্রান্তের ধুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯০০০ পর্যন্ত জীবাণু থাকতে পারে। গড়ে এ সংখ্যা প্রতি গ্রামে ১০০০০। প্রত্যেক জীবাণু দিনে ১০টি নতুন সৃষ্টি করে। এদের বেঁচে থাকার মেয়াদ ৩০ দিন। এদের খাদ্য পশুর লোম এবং ত্বকের মৃত কোষ। সুতরাং যেখানে মানুষের বাস, সেখানেই এদের বসবাস। এরা কামড়ায় না, অন্য কোনো রোগ ছড়ায় না এবং মানুষের শরীরে বাসা বাঁধে না। এরা শুধু সেই মানুষগুলোর প্রতি ক্ষতিকর যাদের এ জীবাণুদের প্রতি অ্যালার্জি রয়েছে। সাধারণত বাড়িতে যেসব জীবাণুরোধ ব্যবহার করা হয়, যেগুলো দিয়ে এদের অপসারণ করা যায় না। ফলে ঘরে ধুলোর জীবাণুর পরিমাণ কমানো সম্ভব হয় না। ঘরে ধুলোতে ছত্রাক থাকে কেন ছত্রাক থাকে সাধারণ বাইরের বাতাস। তবে যে কোনো বাড়িতেই ছত্রাক কলোনি তৈরি হওয়া সম্ভব। বাড়ির বাসিন্দারা হয়তো দেয়ালে ছত্রাকের কলোনি দেখতে পায় না কিন্তু সেটি ঠিকই তৈরি হতে থাকে। দুটি জিনিস ঘরের মধ্যে ছত্রাকের কলোনি গড়তে বিশেষ ভূমিকা রাখে। (১) বেশি আর্দ্রতা শতকরা ৫০-এর বেশি। পানির পাইপে ক্ষুদ্র ফুটা বা যে কোনো পানির প্রবাহ এতে ভূমিকা রাখে। (২) দেয়ালে কোনো বোর্ড থাকলে বা স্যাঁত-সেঁতে আসবাব থাকলে সেখানে ছত্রাক জন্মায়। ছত্রাকের স্পোর কাপড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এ স্পোর থেকে সুনির্দিষ্ট জীবনচক্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ছত্রাক তৈরি হয় অনুকূল পরিবেশে। যেসব রোগীর ছত্রাকে অ্যালার্জি আছে, তারা ছত্রাক অধ্যুষিত বাড়িতে থাকলে নিশ্চিতভাবে ছত্রাকজনিত অ্যালার্জির শিকার হন। কারণ তারা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছত্রাক গলাধকরণ করেন। ঘরের ধুলোতে তেলাপোকা থাকে কি? তেলাপোকার বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ঘরের ধুলোতে মিশে থাকে। বিশেষ করে পুরনো বাড়ি ও ফ্ল্যাটবাড়ি যেখানে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বিভিন্ন পরিবার বাস করে, সেখানে তেলাপোকা নির্র্মূল করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। অ্যালার্জি আক্রান্ত ব্যক্তি বিশেষ করে অ্যাজমা রোগী এ ধরনের বাড়িতে গেলে তার উপসর্গ বেড়ে যায়। বেঁচে থাকাও বংশবিস্তার করার জন্য তেলাপোকার দরকার খাদ্য ও আর্দ্রতা। এগুলো থেকে বঞ্চিত করতে তেলাপোকার হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়। ঘরের ধুলোর অ্যালার্জি কি মৌসুমী? দেখা গেছে আমেরিকাতে ধুলোর জীবাণুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয় জুলাই-আগস্টে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ উচ্চসংখ্যা বজায় থাকে। বসন্তের শেষের দিকে ধুলোর জীবাণু ঘটিত অ্যালার্জির সংখ্যা সবচেয়ে কম থাকে আমেরিকায়। এ ধরনের কিছু রোগী জানিয়েছেন, তাদের উপসর্গ সবচেয়ে বেশি হয় শীতকালে। এর কারণ হচ্ছে মৃত জীবাণু এবং জীবিত জীবাণুদের বর্জ্য উভয়ই অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন মৌসুমে ছত্রাকের পরিমাণেও কম-বেশি ঘটে। দেখা যায় গ্রীষ্মের সময় তেলাপোকার পরিমাণ বেশি হয়। বাতাসে ধুলোকণার পরিমাণ বেশি হয়। আর গ্রীষ্মকালে মানুষ বাড়িতে সচরাচর বেশি সময় কাটায় বলে এ সময়ে অ্যালার্জির উপসর্গও বৃদ্ধি পায়। কীভাবে বুঝবেন যে আপনার ধুলোজনিত অ্যালার্জি রয়েছে এ ক্ষেত্রে আপনাকে অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে। তিনি আপনার উপসর্গগুলো লক্ষ্য করবেন, আপনার গৃহ ও কর্মস্থলের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইবেন। প্রশ্ন করবেন আপনার অভ্যাস, পারিবারিক রোগের ইতিহাস, উপসর্গ কমা বা বাড়ার প্রবণতা, পোষা প্রাণীর ধরন সম্পর্কে। তারপর তিনি আপনার শরীরে একটি পরীক্ষা করবেন যার নাম স্কিন-প্রিক টেস্ট। সেই সঙ্গে রক্ত পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের অ্যালার্জির উপসর্গ কমাতে কী করবেন তিনটি মৌলিক চিকিৎসার ধাপ রয়েছে_ ০ ধুলোর জীবাণু থেকে দূরে থাকা ০ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ ০ ইমিউনোথেরাপি কীভাবে ধুলোর জীবাণু থেকে দূরে থাকবেন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে ঠিক কোন ধরনের ধুলো উপাদান থেকে আপনি অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ধুলোর জীবাণু পরিপূর্ণভাবে অপসারণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবে আপনি কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, যাতে পরিমাণটা অন্তত কম থাকে। অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন। শোবার ঘরের দিকে বিশেষ নজর দিন গড়পড়তা হিসেবে মানুষ তার জবিনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটায় বেডরুমে। সমঅক্ষায় দেখা গেছে, ধুলোর জীবাণুর পরিমাণ বেশি থাকে শোবার ঘরে। এ জন্য ধুলো-অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শোবার ঘরের দিকে বেশি মনযোগ দিতে হবে। ০ বেছে নিন এমন শোবার জিনিসপত্র যেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা যায় এবং যাতে অ্যালার্জি পরিমাণ কম থাকে। বালিশে ফোম বা তুলো ব্যবহার না করে সিনথেটিক জিনিস ব্যবহার করুন। সপ্তাহে অনন্ত একবার বিছানাপত্র ধুয়ে রেখে শুকিয়ে নিন। ০ সম্ভব হলে বেডরুমে এয়ারকন্ডিশনার ও আর্দ্রতারোধক যন্ত্র ব্যবহার করুন। আর্দ্রতা কম থাকলে জীবাণু ও তেলাপোকার বংশবিস্তার রোধ হবে। ০ জানালায় সুক্ষ্ন কাপড়ের ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো ঘন ঘন বদলাতে হবে। কাপর-চোপড় ক্লোজেটে রাখুন। ক্লোজেটের ঢাকনা বন্ধ রাখবেন। ০ ঘরে কোনো মৃত প্রাণী বা প্রাণীর অংশ থাকলে অবিলম্বে বাইরে ফেলে দিন। ০ শোবার ঘরে কখনো পোশা প্রাণীকে ঢুকতে দেবেন না। মেঝের ধুলো কমানো ০ নিয়মিত বিরতিতে ঘর পরিষ্কার করুন। মেঝে মোছার সময় স্যাঁত-সেঁতে ও তৈলাক্ত কাপড় ব্যবহার করবেন না। ঘর পরিষ্কারের সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন। ০ শোবার ঘরে কার্পেট ব্যবহার না করাই উত্তম। ব্যবহার করলেও এমন ধরনের কার্পেট নেবেন যেগুলোর আশ সুবিন্যস্ত। ০ যেসব জিনিস ও আসবাবপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা সম্ভব নয়, সেগুলো বেডরুমে না রেখে অন্যত্র সরিয়ে ফেলুন। ঘরের বাতাসের ধুলো কমানো এমন ধরনের এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করুন যার দ্বারা ঘরের আর্দ্রতা শতকরা ৫০ ভাগের নিচে রাখা সম্ভব। এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করুন প্রয়োজনে ঘন ঘন ফিল্টার পরিবর্তন করতে হবে। তবে মনে রাখবেন যে ধুলোর জীবাণু বেশিক্ষণ বাতাসে থাকতে পারে না। তাই মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কারের দিকেই আপনাকে বেশি নজর দিতে হবে।
আডি/ ১৩ নভেম্বর









