শরীর চর্চা

কোষ্ঠকাঠিন্য তাড়াতে ইচ্ছাই যথেষ্ট

স্বাস্থ্য বিষয়ক এক ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, নারী-পুরুষ সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে একবার হলেও কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত হবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসকই বলেন, তারা আগের তুলনায় কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগী বেশি পাচ্ছেন।

কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে প্রফেসর ডা. মো আজিজুল হক বলেন, “আজকের দিনে বহু মানুষের কাছে কোষ্ঠকাঠিন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মিত মলত্যাগ করতে না পারলে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে একটি কথা আমাদের সবার মনে রাখতে হবে। আর তা হলো, মলত্যাগের জন্য প্রযোজ্য কোনো নিয়ম নেই। অভ্যাসসহ নানা কারণে কেউ দিনে তিন বার এ কাজ করেন। আবার কেউ কেউ সপ্তায় এক বা দুই বার এ কাজটি করে থাকেন। তবে সাধারণভাবে একনাগাড়ে যদি তিন দিন কেউ মলত্যাগ না করেন তবে সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দেখা দিতে পারে। কারণ তিনদিন ত্যাগ না করা হলে সে মল বেশ শক্ত হয়ে যায় এবং তা সহজে বের হতে চায় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন, সপ্তায় অন্তত দুইবার কোষ্ঠ পরিষ্কার না হলে, পেট পরিষ্কার হয়নি বলে যদি ২৫ শতাংশ সময় মনে করা হয়, তলপেট ও তার আশেপাশের অংশে যদি ব্যথা অনুভূত হয় বা মলত্যাগের জন্য দীর্ঘ সময় লাগে তবে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা যায়।

কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয় এমন একটি প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। চিকিৎসাবিদরা বলে থাকেন, এর নানা কারণ থাকতে পারে। তবে খাবার-দাবারে আঁশ জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ কম থাকলে, রিফাইন বা পরিশুদ্ধ খাবার-দাবার বেশি গ্রহণ করলে। অর্থাৎ ভূষিযুক্ত আটার বদলে ময়দার তৈরি খাবার বেশি খেলে। লাল চালের বদলে মেশিনে ছাঁটা কুড়াবিহীন ধবে ধবে সাদা চাল বেশি খেলে এ সমস্যা হতে পারে। একই সঙ্গে তেল বা চর্বি জাতীয় খাবার এবং আমিষ জাতীয় খাবার বেশি গ্রহণ করা হলে পরিণামে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। অনেকে নানা কারণে সারাদিনে খুব বেশি পরিমাণে পানি পান করেন না। এ জন্য তাদেরও কোষ্ঠকাঠিন্যের ধাত হতে পারে।

কায়িক পরিশ্রম, হাঁটাচলা কিংবা ব্যায়ামের অভাবেও কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিস দেখা দিলে, অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার হলে, মস্তিষ্কে টিউমার হলে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে এ সমস্যা হতে পারে। বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ দিন বিছানায় শুয়ে থাকলে, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, যেমন ব্যথার ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রভৃতি সেবন করলে এবং যেসব ওষুধের মধ্যে আয়রন বা লোহা, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকে সেগুলো গ্রহণ করলেও তারও পরিণামে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

নলকূপের পানিতে বেশি মাত্রায় আয়রন বা লোহা থাকলে একই কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পার। অনেকে অ্যাসিডিটিতে ভুগেন এবং সে জন্য ক্যালসিয়াম বা অ্যালুমনিয়াম সমৃদ্ধ ওষুধ খান। এ কারণেও তাদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের বিভিন্ন ধরনের অসুখ বা সংকটের কারণেও দেখা দিতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য।

গর্ভবতী অনেক মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। তবে সাধারণভাবে অসুখজনিত কোষ্ঠকাঠিন্য বয়সী লোকদের আক্রমণ করে।
কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। পেট ফাঁপা আছে বলে মনে হতে পারে, ক্ষুধা কমে যেতে পারে। পেট বা তলপেটে ব্যথা হতে পারে। কারো কারো বমি পর্যন্ত হতে পারে। বেশিদিন কোষ্ঠকাঠিন্য চলতে থাকলে পায়খানা করার ইচ্ছা লোপ পেতে পারে। অন্যদিকে একই সঙ্গে পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। হেমোরোয়েড বা পাইলস বা অর্শ দেখা দিতে পারে। দেখা দিতে পারে এনালফিশার কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্যে যিনি দীর্ঘ দিন ধরে ভুগছেন তার রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্বার বাইরে বের হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যে সব কোষ্ঠকাঠিন্য কোলন ক্যান্সার এবং মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য দেখা দিয়েছে সে সব কোষ্ঠকাঠিন্যের দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। এ সব রোগের চিকিৎসা করাতে দেরী হলে বা সময়মতো চিকিৎসা করা না হলে রোগীর অকালমৃত্যুও হতে পারে।

সাধারণ ভাবে দু’সপ্তার বেশি কোনো কোষ্ঠকাঠিন্য স্থায়ী হলে সংশ্লিষ্ট রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা দরকার। এ ছাড়া হঠাৎ করে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে, মলের সঙ্গে রক্ত যেতে শুরু করলে, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়ার পর কোনো কারণ ছাড়াই ওজন হ্রাস পেতে থাকলে। কিংবা মলত্যাগের সময় পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা উচিত।

রোগের কথা উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধের কথাটি উঠে আসবে।
সাধারণ ভাবে চিকিৎসকরা মনে করেন, কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রতিকার করাই হলো এ রোগের সেরা চিকিৎসা। খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করার মাধ্যমে কোষ্ঠকাঠিন্যর কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। শাক-সবজি এবং ফলমূলসহ আঁশ জাতীয় খাবার বেশি করে খেলে কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় এ কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু সমস্যা হলো এই জানা কথাটি আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে মানি না। একই সঙ্গে জীবন যাপনের পদ্ধতিকে যতোটা সম্ভব সক্রিয় করে তুলতে হবে। অর্থাৎ ব্যায়াম চর্চার অভ্যাস নারী-পুরুষ সবাইকে করতে হবে। সব বয়সের মানুষকে ব্যায়াম বা শরীর চর্চাকে সরাসরি দৈনিকের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। আমাদের খাদ্য অভ্যাস তৈরি হয় শিশুকাল থেকে। তাই সঠিক খাদ্য অভ্যাস সৃষ্টি করার দায়িত্বের অনেকটাই বর্তায় অভিভাবকদের উপর। ছোটবেলা থেকেই যদি শাক-সবজি এবং ফল-মুল খাওয়ার অভ্যাস করা যায় তবে কোষ্ঠ-কাঠিন্যের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের যে কোনো রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে অর্থাৎ নানা রকম ওষুধ দিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে সমস্যাটি দূর করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু এই সুফল ধরে রাখার জন্য অবশ্যই তার খাদ্য অভ্যাস এবং জীবন যাপনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে এই সমস্যা অন্ধ চক্রের মতো ফিরে ফিরে আসবে। তবে কোনো রোগের কারণে যদি এ ধরনের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় তবে দ্রুত সে রোগের চিকিৎসা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করা মোটেও ঠিক হবে না।

আডি/ ১৩ নভেম্বর


Back to top button
🌐 Read in Your Language