Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (57 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১১-২০১৫

বক্তৃতা নয় ভাষণ

আকতার হোসেন


সেদিন ঢাকার সেই বিশাল ময়দানকে কেন্দ্র করে সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে লোক সমাগম। মানুষ যত বাড়ে ততোই বেড়ে যেতে থাকে ব্যাকুল আগ্রহ। কখন আসবেন নেতা, কি বলবেন তিনি! কবির ভাষায়, ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে, ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে; কখন আসবে কবি?...‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন’ তারপর কি হল? তারপর যা হল তাকে বলে ইতিহাস। 

বক্তৃতা নয় ভাষণ

কোন সংগ্রামে যখন জনসাধারণের সর্বাধিক অংশগ্রহণ থাকে তখন গোপন বৈঠক বা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন পরে না। জনতা থাকে জনতার কাতারে আর দিকনির্দেশক উঁচু মঞ্চে। বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক একটি অংশ ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে হাজির হয়েছিল সেই যুগের সবচাইতে বড় খোলা মাঠ ‘রেসকোর্স ময়দানে’ (বর্তমান নাম সোহ্রাওয়ার্দি উদ্যান)। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নেতার কাছ থেকে পরবর্তী দিক-নির্দেশনা নিয়ে যাওয়া। সেই উত্তাল দিনে জনতার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয় ছিলেন মাত্র একজন ব্যক্তি, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, তিনিই নেতা। উত্তাল দিন এইজন্য যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য দেশের ছাত্র-যুবকেরা চরম ত্যাগ স্বীকারের জন্য তখন প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। এরই লক্ষ্যে পাকিস্তানের প্রচলিত চাঁদ-তারা পতাকা পরিত্যাগ করে নতুন একটি পতাকা তৈরি করে ফেলে তারা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মমতা মাখানো একটি গানকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেয়। আশ্চর্য হবার মত যেটি করেছিল তাহলো রাজপথে দাঁড়িয়ে তারা গান স্যালুট দিয়েছিল নতুন জাতীয় পতাকাকে। 
কিন্তু ছাত্র যুবক মানেইতো দেশের সামগ্রিক চিত্র নয়। দেশের অনন্য পেশাজীবী, কৃষক-শ্রমিক, সরকারী কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর সদস্য, দেশের মা বোনেদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকার  দরকার। সেই দিক-নির্দেশনা পেতেই সকাল থেকে দলে দলে আসতে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী লোক। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, “কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক, লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক। হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ..।
নেতা এসে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা বলবেন, তিনি বলবেন স্বাধীনতার জন্য জাতি কতটুকু প্রস্তুত কতোটুকু এখনো বাকি। তিনি ভবিষ্যৎ রূপকার, তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর তর্জনীর উপর দাঁড়িয়ে আছে আগামীর সূর্য। পাকিস্তান সামরিক অফিসার লে: জেনারেল গুল হাসান তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘পাকিস্তান যখন ভাঙলো’তে (Memories of Lt. Gen. Gul Hassan Khan এর বাংলা অনুবাদ) উল্লেখ করেছেন, ‘এখানে বলে রাখা দরকার যে, বেসামরিক কর্তৃপক্ষ মানে হল আওয়ামী লীগ হাই কম্যান্ড, কিংবা সোজা কথায়, শেখ মুজিবুর রহমান’। 
ঢাকায় অবস্থিত অপর এক পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সিনিয়র অফিসার মেজর জেনারেলে খাদিম হুসেইন ও একই ধারনা দিয়েছেন ‘The entire province came to a grinding halt. the provicial civil administration, including the police, struck of work in obedience to Mujib’s call..I do not konw of another parallel example of such complete paralysis of civic life and adminstration..significatnt events were taking place by the hour..’ (A stranger in my own country East Pakistan, 1969- 1971 /Major Gen Khadim Hussain Raja)। 

সেদিন ঢাকার সেই বিশাল ময়দানকে কেন্দ্র করে সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে লোক সমাগম। মানুষ যত বাড়ে ততোই বেড়ে যেতে থাকে ব্যাকুল আগ্রহ। কখন আসবেন নেতা, কি বলবেন তিনি! কবির ভাষায়, ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে, ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে; কখন আসবে কবি?...‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন’ তারপর কি হল? তারপর যা হল তাকে বলে ইতিহাস। একজন কবি যখন কোন রাজনৈতিক নেতাকে ‘কবি’ বলে সম্বোধন করেন, রাজনৈতিক ভাষণকে ‘কবিতা’ বলেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না কেন সেই রাজনৈতিক ভাষণ বিশ্ব সেরা ভাষণ হয়ে যায়। অথবা কি কারণে সেই ভাষণ বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি সেরা ভাষণের সাথে তুলনা করা হয়। যারা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ গণতান্ত্রিক পথকে জানতে চেষ্টা করেছেন অথবা তাঁর একাধিক বক্তব্য কিংবা ভাষণ শুনেছেন তারা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন সেদিন তাঁর ভাষণে যে সমস্ত শব্দ কিংবা বাক্য ব্যবহার করেছেন সেগুলো অতীতেও খণ্ড খণ্ড ভাবে কোথাও না কোথাও তিনি বলেছেন। তাহলে তিনি নতুন কি বলেছিলেন সেদিন? আদতে বঙ্গবন্ধু সেদিন অতীত থেকে ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানে দাঁড়িয়ে সমীকরণ করেছিলেন। একটানা ২৩ বছরের নির্ভুল হিসাব কষেছিলেন বিশ মিনিটের এক ভাষণে। তাঁর ভাষণ শুনে মনে হতে পারে মোহন বাঁশির সুর অথচ পাহাড়ের মত শক্ত বুনিয়াদ প্রথম থেকে শেষ কথাটি পর্যন্ত। সঙ্গত কারণেই শুধু মাত্র ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে ৭ মার্চের ভাষণকে বুঝতে চেষ্টা করলে অনেক কিছু ফাঁকা রয়ে যাবে। 
“৭ তারিখের আগুনের মতো ভাষণ হলো শেখ সাহেবের...কাউকে ভয় দেখাতে হলো না, জোর করতে হলো না বন্ধ হয়ে গেল স্কুল-কলেজ কোর্ট-কাছারি। সরকারি বেসরকারি সমস্ত অফিসেই তাল ঝুলল। শুধুমাত্র শেখ সাহেবের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে। সবাই বুঝতে পারছে ঝড় আসছে। বহুদিনের সঞ্চিত সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ফুলে উঠেছে। বাঁধ দিয়ে ঠেকানো যাবে না” (‘একাত্তর এবং আমার বাবা’ - হুমায়ূন আহমেদ)। তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, নতুন স্বপ্নে বিভোর বাঙালি জাতি কিংবা কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমনটি বলেছে “বিদ্রোহী শ্রোতা”  শুধু তারাই অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে নি, ৭ মার্চের ভাষণের জন্য সেদিন অপেক্ষা করে বসে ছিল গোটা বিশ্ব এমন কি যাদের ঘর ভেঙ্গে যাচ্ছিল সেই পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীও। তৎকালীন পাকিস্তান মার্শাল-ল সরকার ৭ মার্চ তারিখেই চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিল। কি বলবেন শেখ মুজিবুর রহমান সেটা ধারণ করার জন্য বিদেশী সাংবাদিক এসে ভরে গিয়েছিল ঢাকা শহর। প্রতিটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল চরম আতঙ্ক। শেখ মুজিব কি বিদ্রোহ ঘোষণা করবেন। গৃহযুদ্ধের ডাক দেবেন? সরকারি অফিস কিংবা ক্যান্টনমেন্ট হামলা করতে ইশারা দেবেন? গভর্নর হাউজ ঘেরাও করবেন নাকি একবাক্যে বলে দেবেন পাকিস্তানের পূর্ব অংশ আজ থেকে নতুন দেশ ‘বাংলাদেশ’ নামে আত্মপ্রকাশ করল।
একটি দেশের জনগণের হাতে যতটুকু গণতান্ত্রিক ক্ষমতা থাকে তার পুরোটা ব্যবহার করে দেশবাসী শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামীলীগকে শক্তিশালী করে দিয়েছিল। ১৯৭০ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তাঁর দলের একক সিদ্ধান্তই ছিল পাকিস্তানের আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভাগ্য নির্ধারণের মন্ত্র। সেই লক্ষে মার্চ মাসের ৩ তারিখে ঢাকাতে পার্লামেন্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলি ভূট্টোর সাথে গোপন পরামর্শ করে যখন পূর্ব-নির্ধারিত পার্লামেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিলেন তখন কারো বুঝতে বাকি থাকল না যে ফুটন্ত তেলের উপর জ্বাল হতে শুরু করেছে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ। কিন্তু শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য তো জনগণ ভোট দেয় নি। তাঁর নির্বাচনের ইশতেহারেও স্বাধীনতার ইঙ্গিত ছিল না। ছিল পাকিস্তান কাঠামোর ভেতর ৬ দফার বাস্তবায়ন। যেটা কার্যকর হলে বাঙালিদের বঞ্চনার অবসান ঘটবে। ক্ষমতার সমতা আসবে। কাজেই শেখ মুজিবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কি করে ৬ দফার ম্যাণ্ডেটকে স্বাধীনতার পক্ষে ব্যবহার করা যায়। তাই এতো উৎকণ্ঠা এতো আতঙ্ক আর উদ্বেলিত মুহূর্ত। এমন পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবের ভেতর প্রচণ্ড মানসিক চাপ ছিল কেননা দেহমনে তিনি একজন মানুষ ছিলেন। আবার তাঁর উপর অর্পিত গুরু দায়িত্বে যেন ফাটল না ধরে সেটা বুঝেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে রাখা ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সব চাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।  জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে এমন কিছু তাঁর পক্ষে করা সম্ভব ছিল না সেদিন।  এ সব মেনেই দেখার বিষয় ছিল শেখ মুজিবর রহমান কি ভিয়েতনাম, লাওস কম্বোডিয়া আলজেরিয়ার মত স্বাধীনতার মুক্তিফৌজ গঠন করবেন নাকি শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার পথ খোলা রেখে পাকিস্তানকেই বাধ্য করবেন চরম পরিণতি মেনে নিতে। এ যেন দাবার গুটির চাল, কে কাকে মাত করতে পারে। শেখ মুজিব যে অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সাথে  নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিলেন সে কথা অধিকাংশ বিশ্লেষক স্বীকার করে নিয়েছেন। সেদিন যদি পাকিস্তান ভেঙে দিতে বিচ্ছেদের আক্ষরিক শব্দসমূহ ব্যবহার করা হতো অর্থাৎ হাতের কাছে মাইক এবং বিশাল সমর্থক পেয়ে অনুন্নত দেশগুলোর সামরিক অফিসারদের মত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বা নিজেকে প্রেসিডেন্ট বা বিপ্লবী সরকারের প্রধান বলে ঘোষণা দিতেন শেখ মুজিব তাহলে কি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকত? এ প্রশ্নের জবাবে বেশিভাগ উত্তর আসে ‘না’। যেমন; ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে শারমিন আহমেদ লিখেছেন; ‘মুজিব কাকু তাঁর তেজোদীপ্ত আবেগময় ভরাট গলায় আসন্ন স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রস্তুতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। এই ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়নি। পাকিস্তান সরকার যাতে তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়ার সুযোগ না পায় এবং বিশ্ববাসী যাতে বুঝতে পারে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়া সরকারের প্রচণ্ড অসহযোগিতা ও নির্যাতন স্বত্বেও শেষ অবধি চেষ্টা করেছে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বৈরাচারী সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটাতে’ আবুল মনসুর আহমদ ৭ মার্চ সম্পর্কে লিখেছেন; ‘..সভায় সমবেত বিশ লাখ নিরস্ত্র জনতাকে সংগিন উচা করা সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর গুলির মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইত। তাতে নিরস্ত্র জনতাকে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বহুগণে বিপুল নিষ্ঠুরতর হত্যাকাণ্ডের শিকার বানানো হইত’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)। 

জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বহুগণে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী তবে সেটা ঠিক ৭ তারিখে হয়নি, হয়েছিল ১৮ দিন পর থেকে। যে কোন নিষ্ঠুর কাজ করার জন্য প্রয়োজন হয় পাষাণ ব্যক্তির তদারকি। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সে সময়কার পাষাণদের মধ্য সবচাইতে বেশি পাষাণ ছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। তাকেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৭ মার্চ তারিখে ঢাকায় গভর্নর করে নিয়ে আসা হয়। পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা যে খারাপ তা বেশ অনুমান করা যাচ্ছিল। এই টিক্কা খানকে কসাই টিক্কা নামে জানত সকলে। 

কসাইকে যখন দায়িত্ব দেয়া হয় তখন পরিস্থিতি কিছুতেই স্বাভাবিক থাকে না। শুধু টিক্কা খানই নয়, ঢাকায় তখন একের পর এক মেডেল পাওয়া সামরিক অফিসারদের আগমন ঘটতে থাকে। সে রকমই এক উচ্চ পদস্থ অফিসার মেজর জেনারেলে খাদিম হুসেইন তার বইতে লিখেছেন;
‘on 1 March 1971, I had quick consultation with my senior staff and some commanders available in Dhaka regarding the feasibility of conducting ‘Operation Blitz’.. I told the emissaries to inform Sheikh Mujib that, during his speech, I would have the army armed with guns and tanks standing by in the cantonment, ready to move immediately…I would discharge my duty without hesitation and with all the power at my command. I would have the army march in immediately with orders to wreck the meeting and, if necessary, raze Dhaka to the ground (a stranger in my own country East Pakistan, 1969-1971)
‘প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব’ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ৭ মার্চে কেন সম্ভব হল না? এটা সম্ভব না হবার কারণ হল, যাকে উদ্দেশ্য করে তাদের পরিকল্পনা সেই শেখ মুজিবুর রহমানকে ষোলআনা তো দূরের কথা একআনাও চিনতে পারেনি পাকিস্তানের সামরিক শক্তি। গুপ্তচর লাগিয়ে পদে পদে তারা শেখ মুজিবকে অনুসরণ করেছে বটে কিন্তু তাঁকে বিন্দুমাত্র অনুধাবন করতে পারে নি। সারাজীবন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন স্বাধীনচেতা মানুষ কোনভাবেই তার আদর্শ থেকে নেমে আসবেনা সেটা সামরিক বাহিনীর কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষিত লোকেরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। যুগে যুগে বাংলার মাটিতে রাজা-বাদশাহ জমিদারি-সুবেদারিদের বিরুদ্ধে অনেক বিপ্লব-সংগ্রাম হয়েছে। ক্ষুদিরাম বোমা ছুঁড়ে মেরেছিল সুদূর ইংল্যান্ড থেকে এসে রাজত্ব করা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সূর্য সেন করেছিল ইংরেজদের হাতিয়ার লুটে নেবার মত সাহসিক কাজ। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা রক্ত দিয়েছিল। ১৯৬৬ তে অধিকার আদায় করতে গিয়ে রক্ত ঝরিয়েছিল বাংলার শ্রমিক, ১৯৬৯ এর ছাত্র জনতার আত্মাহুতি ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন। গর্ভধারণ ছাড়া যেমন কোনো শিশু জন্ম নেয় না তেমনি আন্দোলন ও সংগ্রাম ছাড়াও স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। যে স্বাধীনতা এলে বাঙালির মুক্তির পথ সুগম হবে সেই স্বাধীনতার নেতৃত্ব যার কাঁধে তুলে দেয়া, যাকে ভালবেসে নাম দেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু, তিনি যে ষড়যন্ত্র করে কিংবা অগণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা করতে পারেন না, পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা সেটা বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। তারা মনে করেছিল শেখ মুজিব বুঝি সিভিল ক্যু করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসবে। অথচ ৭ মার্চের ভাষণের আগেও তিনি উচ্চারণ করেছেন আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, যার পুনরাবৃত্তি করেছেন ৭ মার্চের ভাষণেও। জাতির পিতার মত উচ্চ আসন যার জন্য খালি পরে আছে সেটা ছেড়ে দিয়ে বাঙালি জাতীর কাণ্ডারি পাকিস্তানের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কেন সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন! এই সামান্য কথাটি বোঝে নাই বলেই আত্মসমর্পণের দলিলে সাক্ষর করতে হয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক গোষ্ঠীকে। 
যে গোলা বারুদ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্সের বাইরে এবং হেলিকপ্টার থেকে পরার কথা ছিল তার থেকে শক্তিশালী বোমা ফুটে উঠেছিল রেসকোর্সের মধ্য অবস্থিত মঞ্চের উপর থেকে। সেদিন মঞ্চ থেকে একের পর এক যে শব্দ গোলা বেরিয়ে এসেছিল আজো তা প্রতিধ্বনি তুলছে আকাশে বাতাসে।  ‘This historic speech of the Bangabandhu delivered on March 7, 1971 came to be known as the VOICE OF THUNDER.. it was in fact the voice of 75 million people of Bangladesh, the voice of suffering humanity, the voice of love and liberty’ (Voice of Thunder, Obaidul Huq)।  

৭ মার্চ ভাষণে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শেখ মুজিবর রহমান (আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না, ভালো হবে না) পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ নয়মাস পর সেই কথা শুনতে বাধ্য হয়ে একই উদ্যানে এসে আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু সঠিকভাবে ৭ মার্চের ভাষণের কথাগুলো অনুধাবন করতে পারলে (কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না) এবং নয়মাস বিলম্ব না করলে আজ কোনো পক্ষকেই মৃত্যু-বেদনা বহন করতে হত না। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে এযাবৎ যত কিছু লেখা হয়েছে যত কথা বলা হয়েছে যতবার শোনা হয়েছে তার যদি সঠিক হিসাব পাওয়া যেত সেই হিসাবই প্রমাণ করে দিত যে এই ভাষণের চাইতে অন্যকোন ভাষণ দুনিয়াতে বেশি জনপ্রিয় হবার কথা না। অনুন্নত বিশ্বের অংশ হবার কারণে বাংলাদেশের নেতা প্রদত্ত ভাষণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব এ যাবত মাথা ঘামায় নি। এছাড়া ইংরেজিতে না হয়ে ভাষণটি বাংলায় হবার কারণে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণে এগিয়ে আসে নি বিদেশীরা। বরং বাংলাদেশের মানুষই খুঁজে খুঁজে জগত বিখ্যাত কয়েকটি প্রধান ভাষণের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করে বিভিন্ন ভাবে প্রচার করেছে। অন্তর্জাতিক মানের সবচাইতে আলোচিত যে ভাষণগুলোর সাথে ৭ মার্চের তুলন করা হয় সেই ভাষণগুলোর অন্যতম হল (১) উইনস্টন চার্চিলের We Shall Fight on the Beaches (২) আব্রাহাম লিংকনের The Gettysburg Address এবং (৩)মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) এর I Have a Dream
এই তিনিটি ভাষণের সমকক্ষ মনে করা হলেও আদতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সঠিক তুলনাটি হতো যদি ৭ মার্চের ভাষণের সাথে একই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর যে-কোন দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রদত্ত ভাষণের তুলনা করা যেত। সে রকম ভাষণ কেউ না কেউ অবশ্যই দিয়েছেন। হয়তো সেটা সংরক্ষিত থাকেনি কিংবা দুষ্প্রাপ্য। কোন দেশের স্বাধীনতা হাসতে হাসতে এসে যায় না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ‘কখন আসবেন নেতা’ এরকম বিশেষ মুহূর্ত। শুধু নেতা পেলেই হবে না একই সাথে তৈরি হতে হবে জনগোষ্ঠীকে, থাকতে হবে পারিপার্শ্বিক সহযোগিতা এবং শত্রুপক্ষকে চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি। এক কথায় স্বাধীনতার সুবর্ণক্ষণ। কাজেই উপযুক্ত তুলনা হয়তো হবে না তবুও ভাব ও ভাষার খুব কাছাকাছি থেকে উপরের তিনটি ভাষণের সাথে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের কিছুটা তুলনা করা যাক। 

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর বিখ্যাত ভাষণটি দিয়েছিলেন জনপ্রতিনিধিদের সামনে। ভাষণের স্থান, আশেপাশের পথঘাট এমনকি রাষ্ট্রের কোথাও ছিল না শত্রু পক্ষের উপস্থিতি। উইনস্টন চার্চিল ছিলেন সরকার প্রধান এবং ভাষণ দেবার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনী এবং জনসাধারণের মনোবল শক্ত করা। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল জাতির দিক-নির্দেশকের ভাষণ। একজন ক্ষমতার গদিতে বসা ছিলেন অন্যজন জনতার ক্ষমতায়নের জন্য শত্রু-পরিবেষ্টিত পরিস্থিতিতে ভাষণ দিয়েছেন। উইনস্টন চার্চিল যে যুদ্ধকে উপলক্ষ করে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই যুদ্ধ এবং আসন্ন বিপদের সাথে গোটা বিশ্ববাসী পরিচিত ছিল। সেই সমস্ত দিনে পৃথিবীময় যুদ্ধের খবর প্রচার হত মিনিটে কিংবা ঘণ্টায়। হিটলারের দখলে কখন কোন দেশ চলে যাচ্ছে কোথায় কতজন মৃত্যু বরণ করল সে খবর জানার জন্য সকলে উদগ্রীব থাকত। সে রকম এক পরিস্থিতিতে চার্চিল উল্লেখিত ভাষণটি দিয়েছিলেন। 
অন্যদিকে, মিছিলে কিংবা সভা সমিতিতে দাঁড়িয়ে নিজ জাতির জন্য সমতা, স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন চাইতে চাইতে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সরকারের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে যারা বছরের পর বছর জেলে পুরে রেখেছিল এমনকি ফাঁসিতে চড়াতে গিয়েও বাঁধা পেয়ে পরিকল্পনা থেকে ফিরে এসেছে তারাই ছিল দেশের হর্তাকর্তা। তাদের 

ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলতে এসেছিলেন স্বাধীনতার কথা। বিশ্ববিধাতা তাঁকে জন্ম দিয়েছিল বাংলার জন্য জীবন উৎসর্গ করার। তাই ৭ মার্চের ভাষণে খুব স্পট করে বলতে পেরেছিলে। ‘ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েও আমাকে মারতে পারে নাই, জীবনে কখনো আমি আপনাদের সাথে বেইমানি করি নাই, আমি জীবন দিতে প্রস্তুত’। 
দুটি ভাষণ প্রদানকারী দুই ব্যক্তির নিজস্ব নিরাপত্তাজনিত অবস্থা ছিল দুই প্রকার। বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্যক্তি হিসেবে এক নম্বর টার্গেট এবং তাঁকেই দিতে হয়েছিল ভাষণ। অন্যদিকে চার্চিলের নিজস্ব প্রাণনাশের হুমকি ছিল না এমনকি জেল-জুলুমের ভয়ও ছিল না। বরং রাষ্ট্রের সমস্ত সিকিউরিটি তাঁকে পাহারা দিয়ে রেখেছিল। কাজেই উইনস্টন চার্চিল আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দুটোই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হলেও ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। একটি ভাষণ ছিল স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ, অন্যটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি। 
একজনের হাতে ছিল নিয়মিত দক্ষ সৈনিক এবং উন্নত হাতিয়ার ও কলাকৌশল। অন্যজনের ভাষণ ছিল ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক জনতাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রীসভা, সংসদ সদস্য এবং দেশের রাজা কর্তৃক পরামর্শ পেয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ৭ মার্চে ভাষণ দিতে দিতে বঙ্গবন্ধু নিজের অবস্থান নেতা থেকে সরিয়ে পিতাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন বললেন ‘১৯৬৬ সালে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে’ তারপর থেকে পিতৃত্বের অভিভাবকের মধ্যে থেকেই তিনি কথা বলেছেন। ভাষণের শুরুতে ‘আপনি’ (‘আপনারা সবই জানেন ও বোঝেন’) বলে শ্রোতা ও দেশবাসীকে সম্বোধন করলেও প্রয়োজনীয় এবং প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে তিনি বহুবার ‘তুমি’ ব্যবহার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দূরদর্শিতা হল, সাধারণ জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে যাদের পেশাগত সামরিক ট্রেনিং আছে তাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা। এরকম  নির্দেশ দেয়া খুব সহজ কাজ ছিল না। একমাত্র জনযুদ্ধের স্বপ্নদ্রষ্টাই এমনটি বলতে পারেন। যেখানে তাঁর সামনে কোন ব্রিগেডিয়ার আর বিগ্রেডিয়ার থাকে না, একজন জেনারেলও সাধারণ সৈনিক হয়ে যায়। এমনটি যিনি বলতে পারেন তিনিই প্রকৃত সর্বাধিনায়ক। মনে রাখতে হবে সেই সমস্ত দিনে সামরিক বাহিনীর শিক্ষা ছিল ভিন্ন। একদিনের সিনিয়র জুনিয়ারের মধ্যে আচার-আচরণে ছিল বিস্তর ব্যবধান। একদিন কেন, এক ঘণ্টার ব্যবধান হলে স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত সেনাবাহিনীর সদস্যরা অথচ তাদেরকেই বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন বেসামরিক লোক অর্থাৎ কৃষক-শ্রমিক-মজুরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে। উইনস্টন চার্চিলকে বলা হয়েছে যুদ্ধের জন্য যোগ্য নেতা কিন্তু শান্তির জন্য নয়। এর প্রমাণ, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে তাঁর দক্ষতার কারণে হিটলার বাহিনীর পতন হয়েছিল ঠিকই কিন্তু যুদ্ধ শেষে নির্বচনে তাঁর নিজের ভরাডুবি হয়। অথচ ৭ মার্চের ভাষণের পর বঙ্গবন্ধু এতোই জনপ্রিয় হন যে শত্রুর হাতে বন্দী থাকা অবস্থায়ও জাতিকে তিনি প্রেরণা  যুগিয়েছেন এবং জাতির পিতা খেতাবে ভূষিত হন।  
ব্রিটিশবিরোধী  আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধির অনশনের কথা শুনে চার্চিল তাঁর মৃত্যু কামনা করেছিল। ভারতের স্বাধীনতাকামী এই নেতাকে চার্চিল বলেছিল হাফ নেকেড ফকির। অথচ বঙ্গবন্ধু তার পরম শত্রুকেও সম্মান করে কথা বলেছেন; ‘তিনি (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান) আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা... জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব...আপনি আসুন, দেখুন বিচার করুন’। ৭ মার্চের ভাষণে ব্যবহারিক এ সব বাক্য বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুণাবলীর নিদর্শন। চার্চিলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রথম দিকে ফরাসিরা ছিল ব্রিটিশদের মিত্র অথচ মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তাদেরই যুদ্ধ জাহাজ দখল নিতে কামান দাগিয়ে হাজারো নাবিককে হত্যা করেছিল চার্চিল। মহাবিপদ জেনেও বঙ্গবন্ধু তাঁর হত্যাযজ্ঞ পরিকল্পনাকারীদের মানবতার খাতিরে সাবধান বানী শুনিয়েছিলেন “তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না’। অতএব, চার্চিলের ভাষণে কথার জোর থাকলেও নীতির কথা ছিল কিনা সেটা বিবেচনার বিষয়। 

উইনস্টন চার্চিলের আলোচ্য ভাষণের বহুল শ্রুত অংশটি হল: ‘.. we shall fight on the seas and oceans, we shall fight with growing confidence and growing strength in the air, we shall defend our island, whatever the cost may be. We shall fight on the beaches, we shall fight on the landing grounds, we shall fight in the fields and in the streets,’
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের যে-অংশটুকু চার্চিলের থেকে অনুপ্রেরণাপ্রসূত মনে হতে পারে। তা হল, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো’। 
জগতের অনেক রাজনৈতিক নেতা আছেন যারা সফলতার চরমে পৌঁছে গেলেও পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁদের অনেকেই ন্যাচারাল পলিটিশিয়ান ছিলেন না, শুধু ক্ষমতায় যাবার কৌশল জানা ছিল তাদের। কাজেই ক্ষমতার লড়াইয়ে তারা দক্ষ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই সব রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে পরেন যারা জন্ম নেয় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে যেতে। এদের কাছে সংগ্রামটাই মুখ্য, সফলতা নিয়ে ততো বেশি মাথা ঘামান বলে মনে হয় না। বাঙালির পরম সৌভাগ্য সেরকম একটি নেতার হাতেই তারা স্বাধীনতার নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছিল।  চার্চিলের ছিল রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ সে-জন্য সে দল-বদল করে কনজারভেটিভ থেকে লেবার পার্টিতে যোগ দিয়ে আবার কনজারভেটিভ দলে ফিরে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে বাঙালিদের মুক্তি দিতে অতীতের সব সংগ্রামের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তাঁর সাফল্য অংশটুকুকে বলেছেন ‘এবারের সংগ্রাম’। কাজেই রাষ্ট্রকে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায় তার কথা বলেছেন চার্চিল আর বঙ্গবন্ধু নতুন রাষ্ট্র গড়ার কথা বলেছেন তাঁর ভাষণে। তাই দুটো ভাষণের প্রেক্ষাপট এক নয়।

এবার ধরা যাক আমেরিকার ১৬ তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কথা। আব্রাহাম লিংকন ক্ষমতায় বসার আগেই আমেরিকাতে দাস প্রথা বিলোপ সংক্রান্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বিদ্রোহ করে বসে। লিংকন ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় লোক এবং দাসদের প্রতি সদয় অথচ তাকেই নিতে হয়েছিল দক্ষিণ প্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। এমন একটি কাজ করতে তিনি রাজি হন একটা শর্তে । প্রথম গুলিটা দক্ষিনীদের পক্ষ থেকে আসতে হবে। যেটা বঙ্গবন্ধুরে ৭ মার্চের উল্লেখযোগ্য হুশিয়ারি ‘আর যদি একটা গুলি চলে’ এর সাথে মিল খেয়ে যায়। গুলি করা যাদের অভ্যাস এবং গুলি করে মানুষ মারতে যাদের হাত কাঁপে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য সীমা অতিক্রম না করার চেয়ে সাবধান বানী (‘আর যদি একটা গুলি চলে’) আর কি হতে পারে। জাতি যখন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত (‘আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না’) সেই অবস্থায়ও আক্রমণে না গিয়ে শত্রুর প্রথম গুলিটির জন্য অপেক্ষা করার কারণেই বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী না বলে স্বাধীনতাকামী নেতা বলা হয়। সম্ভবত এই কারণেই বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাশে এসে না দাঁড়ালেও সেই 
যুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যুদ্ধ বলতে পারে নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তারা দেখেছে আক্রান্ত জাতির মুক্তির যুদ্ধ হিসেবে। আমেরিকার বিচ্ছিন্নবাদীরা তাদের প্রথম গোলাটি মেরেছিল ১২ এপ্রিল ১৮৬১। সেই থেকে শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ যা ৪ বছর স্থায়ী হয়েছিল। গৃহযুদ্ধে শুধুমাত্র পেনসিলভানিয়া রাজ্যের গেটিসবার্গে ৫০ হাজারের বেশি লোক হতাহত হয়। যুদ্ধ শেষ হলে গেটিসবার্গে বানানো একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করতে গিয়ে সেদিনের শেষ বক্তা হিসেবে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দুই মিনিটের একটি লিখিত ভাষণ দেন। সেটাই পরবর্তীতে বিখ্যাত ভাষণ হয়ে লোক মুখে প্রচলিত হতে থাকে। ভাষণটি ছিল এই রকম; 

Four score and seven years ago (87 years) our fathers brought forth on this continent, a new nation, conceived in Liberty, and dedicated to the proposition that all men are created equal. 
Now we are engaged in a great civil war, testing whether that nation or any nation so conceived and so dedicated, can long endure. We are met on a great battle-field of that war. We have come to dedicate a portion of that field, as a final resting place for those who here gave their lives that that nation might live. It is altogether fitting and proper that we should do this. 
But, in a larger sense, we cannot dedicate -- we cannot consecrate -- we cannot hallow -- this ground. The brave men, living and dead, who struggled here, have consecrated it, far above our poor power to add or detract. The world will little note, nor long remember what we say here, but it can never forget what they did here. It is for us the living, rather, to be dedicated here to the unfinished work which they who fought here have thus far so nobly advanced. It is rather for us to be here dedicated to the great task remaining before us -- that from these honored dead we take increased devotion to that cause for which they gave the last full measure of devotion -- that we here highly resolve that these dead shall not have died in vain -- that this nation, under God, shall have a new birth of freedom -- and that government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth. ( Abraham Lincoln/ November 19, 1863)
লক্ষণীয় যে আব্রাহাম লিংকন এখানে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সেটা হল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের সমতার আদর্শিক রূপ। বহুদিন থেকে অন্তরের মাঝে স্বপ্ন বোনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত মুহূর্তের দিক নির্দেশনা যেভাবে দিতে হয় লিংকনকে কিন্তু সেই ভাবনা ভাবতে হয় নি। তিনি ভাগ্যবান ছিলেন কেননা ৮৭ বছর আগে তাঁর পূর্বপুরুষেরা সেই দুরূহ কাজ সম্পূর্ণ করে গিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হিসাবে জনতার সামনে 
অনুকূল পরিবেশে যে কথা বলা যায় তার বিপরীতে সামরিক রক্তচোষা প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিকুল পরিবেশে উচ্চারিত কথা অবশ্যই ভিন্ন মর্যাদা পায়। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন; ‘আমি তো অনেক আগেই বলে দিয়েছি, কিসের রাউন্ড টেবিল, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো?’ এতেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ দিয়েছিলেন দুই ধরনের শ্রোতার উদ্দেশ্যে। এক তাঁর নিজের পক্ষের শ্রোতা যাদের তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন আর দ্বিতীয় যারা ভিন্ন পক্ষের তাদের তিনি হুঁশিয়ারি বানী শুনিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট লিংকন তাঁর ভাষণে জনগণের শ্রেষ্ঠত্ব বা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে জোর দাবী তুলেছেন, of the people, by the people, for the people সে কথা বঙ্গবন্ধুর ভাষণে আরো স্পষ্ট। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি অন্তত পক্ষে ২০ বার মানুষ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ;  ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’, ‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’, ‘বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস’, ‘আমার বাংলার মানুষের বুকে উপর গুলি করা হয়েছে’, ‘কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে’, ‘আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই’ ইত্যাদি। 

নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রধান তার দায়িত্ব পালনে একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেতে গিয়ে বিখ্যাত করে ফেলেছে তাঁর ভাষণ। অন্যদিকে অতীত থেকে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং সশস্ত্র যুদ্ধ দুটি সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে যে দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন তারই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে শতশত স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এই দুই ব্যক্তির মধ্যে আব্রাহাম লিংকনের শব্দ চয়নের কারণে বিখ্যাত হয়েছে মূল ভাষণটি অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর শব্দ চয়নের কারণে বিখ্যাত হয়েছে তাঁর ভাষণ এবং একই সাথে ভাষণের ভাষণের দিনটি (৭ মার্চ)। শুধু তাই নয়, লিংকনের of the people, by the people, for the people এই তিনিটি কথার বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে একাধিক শব্দ ও বাক্য নিজস্ব প্যাটার্ন তৈরি করে নিয়েছে। ‘ভাইয়েরা আমার’ বলা মাত্রই বোঝা যায় এটা ৭ মার্চ ভাষণে অংশ। ‘আর যদি একটা’ বলার পর আর কিছু বলতে হয় না অমনি কানে বেজে ওঠে ভাষণের সম্পৃক্ত অংশ। ‘কি পেলাম আমরা’, ‘আজ বাংলার মানুষ’, কি ‘অন্যায় করেছিলাম’ এই সমস্ত কথা একান্ত বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেই আর কেউ এই বাক্যগুলো ব্যবহার করতে পারে না। উল্লেখযোগ্য দিক হল; ‘এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ’ বলার পর থেকে’ ইনশাল্লাহ’ এখন বাংলা শব্দ। 

সবশেষে দেখা যাক মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণ। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মুক্তির ঘোষণা বা ‘Emancipation Proclamation’ এবং তার স্বাক্ষরিত আমেরিকার সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর ফলে ২০০ বছরের দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। লিংকনের এই সাফল্যের কারণে তাঁর স্মরণে ওয়াশিংটন ডিসিতে তৈরি করা হয় লিংকন মেমোরিয়াল মনুমেন্ট। সেই মনুমেন্টের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আর একটি বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার আদায় আন্দোলনের অন্যতম নেতা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র)। 
১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট নাগরিক অধিকার আদায় আন্দোলনের সর্বশেষ বক্তা আড়াই লাখ লোকের সামনে বর্ণ বৈষম্য দূর করার লক্ষে তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছেন কালজয়ী এই ভাষণে। লিখিত ভাষণের শেষ অংশে এসে  উপস্থিত জনতার দিকে তাকিয়ে তিনি চিরাচরিত ভঙ্গীতে হাত উঁচিয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন তা হল;  
....And so even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a dream deeply rooted in the American dream.
I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal.
I have a dream that one day on the red hills of Georgia, the sons of former slaves and the sons of former slave owners will be able to sit down together at the table of brotherhood.
I have a dream that one day even the state of Mississippi, a state sweltering with the heat of injustice, sweltering with the heat of oppression, will be transformed into an oasis of freedom and justice.


I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin but by the content of their character. 
I have a dream today!
I have a dream that one day, down in Alabama, with its vicious racists, with its governor having his lips dripping with the words of "interposition" and "nullification" -- one day right there in Alabama little black boys and black girls will be able to join hands with little white boys and white girls as sisters and brothers.
স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সমতার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল। সেই স্বপ্ন পূরণ করার আবেদন রয়েছে কিং এর ভাষণে। উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আর কাউকে কোন ভাষণ দিতে হয় নি।  ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ এরকম অগণিত স্লোগান কবিতা-সঙ্গীত গল্প-উপন্যাস এবং স্বচ্ছ ইতিহাস একটা বিষয় পরিষ্কার করে তুলেছে যে বাংলার মানুষ কিংবা বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড আদায়ের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব স্বপ্ন। তার এই স্বপ্ন পূরণের কাজ তিনি নিজ হাতেই সম্পূর্ণ করে গেছেন।  যখনই তিনি সুযোগ পেয়েছেন জনসম্মুখে তাঁর স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। তারই একটি হল, পাকিস্তানের করাচীতে গণপরিষদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন:
"Sir [President of the Constituent Assembly], you will see that they want to place the word "East Pakistan" instead of "East Bengal." We had demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word "Bengal" has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted. So far as the question of one unit is concerned it can come in the constitution. Why do you want it to be taken up just now? What about the state language, Bengali?”
জনাব কিং তার ভাষণে এমন কোন কথা বলেন নাই যা রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধে যায়। তিনি জাতি সত্তা জাগ্রত করেন নি বরং সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি অগাধ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন সমতার কথা। তিনি তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছেন ‘ I am happy to join with you today’  বলে, অথচ বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি’। কাজেই এই দুটো ভাষণের তুলনা করতে গেলেও প্রেক্ষাপট মনে রেখেই ভাবতে হবে। মার্টিন লুথার কিং বিরুদ্ধচারী করেছেন প্রচলিত বৈষম্য নীতির, তিনি কর্তৃপক্ষ কিংবা শাসককে শত্রু বলে চিহ্নিত করেন নি। মার্টিন লুথার কিং চেয়েছেন সাদা কালো মানুষের সমান অধিকার। অর্থাৎ যা কিছু সাদারা ভোগ করবে কালোদের জন্যও সেই সুযোগ। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, সরকারের বিরুদ্ধে সরকার, বাহিনীর বিরুদ্ধে বাহিনী দাঁড় করিয়েই ক্ষান্ত হন নি, তিনি স্পষ্ট করে সরকারকে শত্রু বলে সম্বোধন করেছেন। ‘শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’। শুধু শত্রু বলেই ক্ষান্ত হন নি অথরিটির বিপক্ষে তিনি যে সমকক্ষ সেকথাও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। অন্ততপক্ষে ১৮ বার তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘আমি’। ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই’, ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে’, ‘আমি শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা’।  মার্টিন লুথার কিং একজন দক্ষ লেখক ছিলেন এবং ছিলেন গির্জার পাদ্রি। তিনি প্রচুর বক্তৃতা দিয়েছেন এবং লিখেছেন একাধিক বই ও প্রবন্ধ। কাজেই তাঁর ছিল বক্তৃতার ভঙ্গি এবং ভাষা চয়নের দক্ষতা। মার্টিন লুথার কিং এর শুধু প্রয়োজন ছিল রাজনীতিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সেই সুযোগ তিনি পেয়ে যান ১৯৫৫ সালে। 

পাবলিক বাসে বসা অবস্থায় একজন সাদা পুরুষকে সিট ছেড়ে দিতে অস্বীকার করায় একজন কালো মহিলাকে (রোজা পার্ক) গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরে চরম উত্তেজনা এবং সমাবেশ হতে থাকে। কিং এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন না, তাঁর হাত ধরেও শুরু হয় নি এই বিক্ষোভ তবে ৩৮১ দিনের বাস বয়কটের অহিংস আন্দোলনের প্রথমে অংশ নিতে না চাইলেও পরবর্তীতে নেতৃতে চলে আসেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের রায় যায় আন্দোলনকারীদের পক্ষে। এই বিজয়ের ফলে নেতৃত্বের দাবিতে তাঁকে আর পিছ-পা হতে হয় নি। বিশবারের মত জেলে যেতে হয়েছে তাঁকে, ছুরিকাঘাতও করা হয়। পুরো জীবন অহিংস আন্দোলনের এই নেতাকে পদে পদে লাঞ্ছিত করা হয়েছে হিংস্রভাবে। মার্টিন লুথার কিং সমর্থিত নিগ্রোদের দাবী আর বঙ্গবন্ধুর মুখে উচ্চারিত নতুন জাতীয়তাবাদের (বাঙালী জাতীয়তাবাদ) স্বরূপ হয়তো একই সুতোয় গাঁথা। তাদের ত্যাগে এবং আন্দোলনের ধারাও বেশ মিল রয়েছে।  


বঙ্গবন্ধুর অহিংস আন্দোলন আর মার্টিন লুথার কিং এর অহিংস প্রতিবাদ এর মধ্যেও সামঞ্জস্য রয়েছে। কিং এর বাড়িতে বোমা ফেলা হয়েছিল। অস্ত্র নিয়ে তাকে হত্যা করতে এসেছিল কিন্তু কিং চোখের বদলে চোখ তুলতে রাজি হয় নি। যেমনটি বঙ্গবন্ধুকে একাধিকবার ফাঁসির খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েও ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেও এই ব্যাপারে তিনি প্রতিশোধ নিতে চান নি। চেয়েছিলেন ব্যক্তিগত আক্রমণের আশঙ্কাকে তুলে ধরে বৃহত্তর আক্রমণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে। কিং এর মৃত্যু হয় কৃষ্ণাঙ্গ ক্লিনারদের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াতে গিয়ে। ক্লিনারদের উদ্দেশ্যে ব্যলাকনিতে দাঁড়িয়ে বক্তৃতাই তাঁর জীবনের শেষ ঘটনা। পরের দিন সকালে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দিতে গিয়ে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এর মর্যাদা পান এবং ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেবার দিন ভোরে তাঁকে হত্যা করা হয়। 
মার্টিন লুথার কিং এবং বঙ্গবন্ধু উভয়ের উল্লেখিত ভাষণই তুমুল করতালির মধ্যে দিয়ে শুরু হয়। দুটি ভাষণই রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে দর্শকশ্রোতারা কালো চশমা পরে শুনেছে। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধি হয়ে কিং সুটেট-বুটেড হয়ে বক্তৃতা করেছিলেন যেটা তাঁর নিজস্ব পরিধান স্টাইল। বঙ্গবন্ধুও স্বদেশী বস্ত্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর সিম্বোলিক কোট পরে এসেছিলেন। দুজনের বক্তৃতা কাব্যিক দোলনায় উড়েছে তবে কিং এর বেলায় এটা ছিল সুপরিকল্পিত শব্দ চয়ন, অনুশীলন নির্ভর। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল অন্তর নিংড়ানো কেননা এখন পর্যন্ত কেউ দাবী করতে পারে নাই যে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে যে কথাগুলো বলেছেন সেটা কোথাও লেখা ছিল। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘৭ই মার্চের ভাষণ আজও জাতির প্রেরণার উৎস-এ উল্লেখ করেছেন সভাস্থানে যাবার আগে বঙ্গবন্ধু যখন বেগম ফজিলাতুন্নেসা্র সাথে কথা বলছিলেন তখন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী তাকে বলেছিলেন ‘কারো কথায় প্ররোচিত না হয়ে নিজ বিবেচনায় যা ভাল মনে করবেন তাই বলবেন’।  এ ছাড়াও সেদিন বঙ্গবন্ধুকে সভা মঞ্চে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রধান আব্দুর রাজ্জাকের উপর। তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সুবিধার্থে তাঁকে কিছু পয়েন্ট লিখে দেয়া হয়েছিল। আমরা এও বলেছিলাম যে, ভাষণের একটা মোটামুটি খসড়া তৈরি করে দেব কি না? তিনি কিছু বললেন না। তিনি পয়েন্ট লেখা কাগজটা রাখলেন কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম তিনি মঞ্চে উঠে যা বললেন, তা লিখিত তো ছিলই না, এমন কি তিনি যে ওই কথাগুলো এরকম ধারাবাহিকভাবে বলে যাবেন, সে বিষয়ে আমরা আগে কিছু আঁচ করতে পারিনি’। মোহাম্মাদ গোলাম মোর্সেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুকে বহন করা গাড়ির চালক। ফকরুল আরেফিনের প্রামাণ্যচিত্র ‘দি স্পিচ’ এ জনাব গোলাম মোর্সেদ বলেছেন, ‘জিগাতলার কাছে গাড়িটি পৌঁছালে আমি জিজ্ঞাস করেছিলাম আজ কি বলবেন? বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন আল্লাহ আমার মুখ দিয়ে যা বলায়’। এ সব কথা থেকে প্রমাণ হয় বঙ্গবন্ধুরে ভাষণ এসেছে তাঁর অন্তর থেকে।

মার্টিন লুথার কিং তাঁর ভাষণে সহিষ্ণু হবার বর্ণনা দিয়েছেন শত বছরের হিসাব কষে, বঙ্গবন্ধু যেটাকে বলেছেন ২৩ বছর। কিং বলেছেন;
But one hundred years later, the Negro still is not free. One hundred years later, the life of the Negro is still sadly crippled by the manacles of segregation and the chains of discrimination. One hundred years later, the Negro lives on a lonely island of poverty in the midst of a vast ocean of material prosperity. One hundred years later, the Negro is still languished in the corners of American society and finds himself an exile in his own land
বঙ্গবন্ধু বলেছেন; ‘আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বৎসরে করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরে ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস’।
নিগ্রো শব্দটি লুথার কিং উচ্চারণ করেছেন ১৫ বার, অপরদিকে বঙ্গবন্ধু বাংলা বলেছেন ১৪ বার (দুবার বলেছেন বাংলাদেশ)। এতে স্পষ্ট হয় যে একজন নিগ্রোদের কথা বলতে এসেছিলেন অন্যজন বাংলার। কিং বলেছেন black men as well as white men, would be guaranteed the “unalienable Rights” of “Life, Liberty and the pursuit of Happiness.”  
বঙ্গবন্ধু বলেছেন; ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম, বাঙালী-নন-বাঙালী যার আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়’।
একপক্ষ উক্তি; America has given the Negro people a bad check, a check which has come back marked “insufficient funds.” অন্য পক্ষ: ‘কি পেলাম আমরা’?
And so, we’ve come to cash this check, a check that will give us upon demand the riches of freedom and the security of justice ‘বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়...আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই’।
Now is the time to make real the promises of democracy. Now is the time to rise from the dark and desolate valley of segregation to the sunlit path of racial justice. .. Now is the time to make justice a reality for all of God's children.
‘এবারের সংগ্রাম আমদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
It would be fatal for the nation to overlook the urgency of the moment.  
‘আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়’

Nineteen sixty-three is not an end, but a beginning. And those who hope that the Negro needed to blow off steam and will now be content will have a rude awakening if the nation returns to business as usual. And there will be neither rest nor tranquility in America until the Negro is granted his citizenship rights
‘রক্তের দাগ শুকায় নাই...আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না... যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হল- কেউ দেবে না’।
We must forever conduct our struggle on the high plane of dignity and discipline. We must not allow our creative protest to degenerate into physical violence. 
‘আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনার হরতাল পালন করেন...তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল’।
The marvelous new militancy which has engulfed the Negro community must not lead us to a distrust of all white people, for many of our white brothers, as evidenced by their presence here today, have come to realize that their destiny is tied up with our destiny.
‘৩৫ সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর  হটাৎ বন্ধ করে দেওয়া হল...তোমরা আমার ভাই, তোমারা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না...’।
Let us not wallow in the valley of despair, I say to you today, my friends ... Go back to Mississippi, go back to Alabama, go back to South Carolina, go back to Georgia, go back to Louisiana,
‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’...
And as we walk, we must make the pledge that we shall always march ahead. We cannot turn back.
 ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না’।
Free at last! Free at last! জয় বাংলা।  Thank God Almighty, খোদা হাফেজ
মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) এবং বঙ্গবন্ধু উল্লেখিত ভাষণের মিল অমিলের প্রশ্নকে বাদ দিয়ে যে কথাটি উল্লেখযোগ্য তা হল দুজনেরই ছিল মানুষের প্রতি অগাধ মায়া-মমতা-ভালোবাসা। তাদের কাজে কর্মেও সেটা প্রতিফলিত হয়েছে। তারপরও যখন এদেরই বিখ্যাত দুটি ভাষণ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় তখন দেখা যায় যে এই ভাষণ দেওয়ার পূর্বে যে বিশাল দায়িত্ববোধ বঙ্গবন্ধুর উপর ছিল তার কিছুই কিং কে পোহাতে হয় নি। কিং তার স্বপ্ন উচ্চারিত করেছেন বেশ জোরাল ভাবে যেটা বিশ্ববাসী শুনেছে। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে সব রকমের নির্দেশ দিয়েছেন তার ভাষণে। একটি স্বাধীন দেশ আদায়ের সংগ্রামে গোলাবারুদের মুখে দাড়িয়েও ইতিহাস, ভূগোল, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ,সামরিক, প্রশাসনিক, মিডিয়া, ভ্রাতৃত্ব, অধিকার, 

সংরক্ষণনীতি, মুদ্রানীতি, দায়দায়িত্ব সহ গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের পন্থা এবং একই সাথে নেতাজির বিপ্লবী পথের (আমায় রক্ত দাও আমি স্বাধীনতা এনে দেবে) সম্ভাবনার প্রতি আলোকপাত করেছেন। যদিও মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণে রক্ত এবং জীবন উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ নেই। কেননা তাঁর কণ্ঠে ছিল সমতার আকুতি। বঙ্গবন্ধু উদ্দেশ্য স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। রক্ত ছাড়া স্বাধীনতার কথা সেযুগে কেন এ যুগেও চিন্তা করা যায় না। তাই সেই কঠিন কাজ শ্রেণীকক্ষের ক্লাস নেবার মত পলিমাটির ভাষা ব্যাবহার করে দেশবাসীকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই ভাষণের পর জাতি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল না ফিরে আসার সংগ্রামে, কেউ ফিরে এলো কেউ এলো না যুদ্ধ থেকে। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন হল ঠিকই, স্বাধীনতা পেল বাঙালী। বিখ্যাত আব্রাহাম লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং দিয়েছিলেন তাঁর বিখ্যাত ভাষণ। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু যে স্থানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই স্থানটি এখন বিখ্যাত।  প্রতিটি জিনিসের একটি কেন্দ্রবিন্দু বা সেন্টার পয়েন্ট থাকে। সাদা কাগজের উপর একটা বিন্দু এঁকে পূবে পশ্চিমে হাজার হাজার মাইল তাকে তাকে টেনে নেয়া সম্ভব। ঐ হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ রেখা, তৈরি হয় মাত্র একটি বিন্দু থেকে। আবার একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে নানান আকারের বৃত্ত তৈরি হয়। ঠিক তেমনি ভাবে বাঙালি জাতির রয়েছে একটি কেন্দ্রবিন্দু। সেটা হল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্ব। যখন থেকে ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতিগত অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে বাঙালি জাতির বীজ বপন হয়েছিল সেদিন থেকে বাঙালিরা ধাবিত হচ্ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা পর্বের দিকে। বাঙালিদের অতীত এসে মিশেছে একাত্তরে। বাঙালিদের ভবিষ্যৎ শুরু হয়েছে একাত্তর থেকে। একাত্তর বাঙালি জাতির কেন্দ্রবিন্দু। সেই কেন্দ্রবিন্দুর অন্যতম উজ্জ্বল অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৭ মার্চের ভাষণ। একে বক্তৃতা বললে ভুল করা হবে। 

আকতার হোসেন: নাট্যকার ও ছোট গল্প লেখক

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে