যুক্তরাজ্য থেকে আসা ৬ জনের দেহে নতুন করোনা

ঢাকা, ১১ মার্চ – দেশে নতুন করে করোনা শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। গত কিছু দিন ধরে প্রতিদিনই বাড়ছে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আবারও কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যেই যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসা ছয় যাত্রীর দেহে করোনার অতিসংক্রামক নতুন ধরন ব্রিটিশ স্ট্রেন পাওয়া গেছে। ফলে হঠাৎ করোনা শনাক্তের হার বৃদ্ধিতে আলোচনায় সামনে চলে এসেছে করোনার এই ধরনটি। জানা গেছে, করোনার নতুন ধরনটি গত জানুয়ারি মাসেই বাংলাদেশে পাওয়া যায়, অথচ সে তথ্য জানা যাচ্ছে এখন।
এ নিয়ে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নতুন ধরনের এই করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নেওয়া হয় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় বিদেশ ফেরতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য অধিদপ্তর নির্ধারিত ঢাকার ২৪টি হোটেলের প্রবেশমুখে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেন ওই হোটেলগুলোয় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকা যুক্তরাজ্য ফেরত কেউ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে আসতে না পারে। আবার বাইরে থেকে কেউ হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। কোয়ারেন্টিন চলাকালে কারও স্বজন যুক্তরাজ্য ফেরত ওই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। তিনি ইন্টারকমে কথা বলতে পারবেন। এ ছাড়া হোটেলে এসব বিদেশ ফেরতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে যেসব সরকারি কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা ঠিকমতো তা প্রতিপালন করছে কিনা তা তদারকিতে বিশেষ টিম গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই টিম প্রতিদিন কতজন নতুন বিদেশ ফেরত ব্যক্তি এলো এবং কতজন কোয়ারেন্টিন শেষে বেরিয়ে গেল তার হিসাব ঠিকমতো রাখা হচ্ছে কিনা তাও তদারকি করবে। এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠাবে বিশেষ টিম।
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য ডেস্কের ইনচার্জ ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমানে যুক্তরাজ্য ফেরত প্রায় ৫০০ যাত্রী প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন। তাদের যথাযথভাবে দেখভাল করতে স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি আরও বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন : অশান্ত নোয়াখালী শান্ত করতে আসছে কঠোর সিদ্ধান্ত
এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের একজন কর্মকর্তা জানান, গত জানুয়ারির শুরুতেই যুক্তরাজ্য ফেরত যাত্রীদের মধ্যে প্রথম নতুন ধরনের এই করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম যে যাত্রীর শরীরে এই নতুন ধরন শনাক্ত হয়, তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে তার শরীর থেকে সংগ্রহকৃত নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে আইইডিসিআর করোনা ভাইরাসের ব্রিটিশ স্ট্রেনটি শনাক্ত করে। এর পর সিলেটে ওসমানী বিমানবন্দরে নামা যাত্রীদের মধ্য থেকেও ভাইরাসের নতুন ধরনে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।
গতকাল সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মুগদা হাসপাতালের সেবা সপ্তাহ উদ্বোধন শেষে দেশে ২ জনের শরীরে করোনার নতুন ধরন পাওয়ার কথা জানান। পরে দুপুরে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এসএম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশে করোনার নতুন ধরনে আক্রান্ত ৬ রোগী শনাক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে করোনা ভাইরাসের যে ধরন খুব দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে বাংলাদেশে শনাক্ত করা ধরনটি সেটিই।
ডা. আলমগীর বলেন, ‘জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আমরা বেশ কয়েকটি ইউকে ভ্যারিয়েন্ট আইডেন্টিফাই করি। ইউকেতে যে ভ্যারিয়েন্ট, তার হুবহু ছিল। এই পেশেন্টরা আমাদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন, আমরা তাদের আইস্যুলেশনে রেখেছি। ইউকের মতো আমাদের এখানে স্প্রেডিং দেখিনি। পৃথিবীর ৮০ দেশে এটি দেখা গেছে। বহু দেশে সংক্রমণ যে বেশি হয়েছে, বিষয়টি এমন না। ইউকের মতো কোথাও হয়নি। আমাদের এই অঞ্চলে সে রকম স্প্রেডিং ক্যাপাসিটি অর্জন করেনি বলেই আমাদের ধারণা।’
ভাইরাসের নতুন ধরনটি দেশে ছড়ানোর বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে ডা. আলমগীর বলেন, ‘ইউকে থেকে যারা আসছে তাদের প্রত্যেককে টেস্ট করিয়ে যাদের পজিটিভ আসছে, তাদের স্যাম্পল সিকোয়েন্সিং করছি। এটি করেই আমরা কয়েকটি পেয়েছি, সেটি অব্যাহত রয়েছে। কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে যাদের কন্ট্রাক্টে এসেছে, তাদের ফলোআপে ১৪ দিন রেখে আমরা রিপিটেড টেস্ট করিয়ে তেমন কিছু পাইনি। আমরা এই ভ্যারিয়েন্টটির সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হয়েছি। এখন পর্যন্ত ৫-৬ জনের কথা বলা হচ্ছে। আমাদের অনেকজনের কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করতে হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত কন্ট্রাক্টের মাঝে কোনো কেস পাইনি।’
যুক্তরাজ্য ফেরতদের নমুনা সাত দিন পর পর পরীক্ষা করা হয় জানিয়ে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘যারই পজিটিভ পাওয়া যায়, তারই সিকোয়েন্সিং করছি। নতুন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে নিয়মিত ফলোআপ করছি। নতুন ধরন টোটাল ৬ জনের মধ্যে পেয়েছি, তারা সবাই ইউকে থেকে ফেরা। তারা ঢাকায় ও সিলেটে অবস্থান করছেন।’ করোনার নতুন ধরন নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এখন প্রথম কাজ হলো- বাংলাদেশে ঢুকছে কিনা? আমরা সেটি করে যাদের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে, সেটি শনাক্ত করে কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ এখন দেশে সংক্রমণ বাড়ার পেছনে ব্রিটিশ স্ট্রেনটির প্রভাব নেই বলেও জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানছি না, যে কারণে সংক্রমণ বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে করোনার নতুন ধরনটি শনাক্ত হয় গত বছরের নভেম্বরে। এটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের ধরনটির চেয়ে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি সংক্রামক বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাজ্যে নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনা ভাইরাস দুই ব্যক্তির দেহে প্রথম পাওয়া যায়। লন্ডন এবং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের আক্রান্ত ওই দুই ব্যক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করে এসেছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ভাইরাসটির নতুন বৈশিষ্ট্য দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত হয়। এ ঘটনার পর দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশটি। দক্ষিণ আফ্রিকায় এরই মধ্যে ভাইরাসের এ ধরন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসের এই বৈশিষ্ট্য বা ভ্যারিয়েন্টটি দ্রুত ছড়ায়। নতুন এই ভ্যারিয়েন্টটির সঙ্গে এর আগে যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া নতুন বৈশিষ্ট্যের আরেকটি ভাইরাসের সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে। যদিও ভাইরাসটি দুটি আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে।
সূত্র : ইত্তেফাক
এন এইচ, ১১ মার্চ









