যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দুই বাংলাদেশির জয়ে সাফল্যের নতুন অধ্যায়
নজরুল মিন্টো

৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আবারও জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই ডেমোক্র্যাট নেতা শেখ রহমান ও মাসুদুর রহমান। জর্জিয়ার পঞ্চম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন শেখ রহমান। অন্যদিকে কানেকটিকাটের চতুর্থ স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী জেন জেনিংসকে পরাজিত করে নিজের আসন ধরে রেখেছেন মাসুদুর রহমান। শেখ রহমান এবার পঞ্চম এবং মাসুদুর রহমান তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হলেন। দুজনই নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের আইনসভার উচ্চকক্ষের সদস্য।
আমেরিকার দুই অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় পৌঁছানো এই দুই বাংলাদেশির জীবনের শুরুটা অবশ্য এমন ছিল না। একজন পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন রেস্তোরাঁয় থালাবাসন ধুয়ে। অন্যজন নতুন দেশে টিকে থাকতে কাজ করেছেন রেস্তোরাঁ, হোটেল ও গ্রোসারি দোকানে। সেই অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং একসময় তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে আইনসভায় প্রবেশ করেছেন। দুজনের জীবনের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও তাঁদের পথচলার মধ্যে রয়েছে অভিবাসী জীবনের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পরিচিত যোগসূত্র।
শেখ রহমানের শিকড় বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সরারচরে। ১৯৮১ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আমেরিকায় যান তিনি। ভর্তি হন নর্থ ক্যারোলাইনার সেন্ট্রাল পিডমন্ট কমিউনিটি কলেজে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষাব্যয় চালাতে ঘণ্টায় ৩ ডলার ৩৫ সেন্ট মজুরিতে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করেছেন। পরে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও গ্লোবাল স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে পান মার্কিন নাগরিকত্ব।
কর্মজীবনে রেস্তোরাঁ খাতের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে পৌঁছান শেখ রহমান। পিৎজা হাট, ডমিনোজ ও ক্রোগারের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর জর্জিয়ায় খুচরা ব্যবসা ও আবাসন খাতে যুক্ত হন। কাজ ও পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। এক বন্ধুর আহ্বানে নর্থ ক্যারোলাইনার গভর্নর নির্বাচনের প্রচারে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই যাত্রা শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র সিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় হন তিনি। ২০১৮ সালে প্রথমবার জর্জিয়ার স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হয়ে পরের বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা গুইনেট কাউন্টির একাংশ নিয়ে গঠিত। জর্জিয়ার সিনেটের প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, তিনিই এই উচ্চকক্ষের প্রথম অভিবাসী ও প্রথম এশীয় আমেরিকান সদস্য। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম মুসলিমও তিনি।
এবার সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পেতে শেখ রহমানকে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গত ১৯ মে ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি রবিন ম্যাককয়কে পরাজিত করেন। শেখ রহমান পান ৬ হাজার ১৮৮ ভোট এবং ম্যাককয় পান ৫ হাজার ১৬৬ ভোট। সেই প্রতিযোগিতা পেরিয়ে নভেম্বরের নির্বাচনে পঞ্চম মেয়াদের জন্য আসন ধরে রাখলেন তিনি।
আইনসভায় বাজেট বরাদ্দ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন, সরকারি কাজের তদারকি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ এবং নগরসংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। নাগরিক অধিকার ও দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান শ্রমজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর বসবাস জর্জিয়ার লরেন্সভিলে।
অন্যদিকে মাসুদুর রহমানের বাড়ি বাংলাদেশের চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে। আমেরিকায় গিয়ে শুরুতে তাঁকেও স্বল্প মজুরির বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে। রেস্তোরাঁ, গ্রোসারি দোকান ও হোটেলে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসা গড়ে তোলেন। পরে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও আবাসন খাতে ব্যবসা বিস্তৃত করেন। ব্যবসা ও হিসাববিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী মাসুদুর রহমানের জীবনীতে তাঁর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া একটি শিক্ষার উল্লেখ রয়েছে। কতবার পড়ে যেতে হলো, তার চেয়ে বড় বিষয় কতবার আবার উঠে দাঁড়ানো গেল।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন তিনি। করোনার কঠিন সময়ে সুরক্ষাসামগ্রী ও খাদ্যসহায়তা বিতরণের কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২১ সালে ম্যানচেস্টারে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ভবন কমিউনিটি সেন্টার। অভিবাসীদের ইংরেজি শেখা, নাগরিকত্ব পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং বাড়িভাড়ার সহায়তা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয় সেখানে। করোনার সময় কেন্দ্রটি টিকাদানের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। খাদ্যসংকটে থাকা পরিবারগুলোর কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
স্থানীয় সমাজসেবার অভিজ্ঞতা নিয়ে মাসুদুর রহমান প্রথমবার কানেকটিকাটের স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হন ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি শপথ নিয়ে ম্যানচেস্টার, গ্লাস্টনবেরি, অ্যান্ডোভার ও বোল্টনের প্রতিনিধিত্ব শুরু করেন। দীর্ঘদিনের সিনেটর স্টিভ ক্যাসানোর স্থলাভিষিক্ত হন তিনি। এবার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হলেন।
কানেকটিকাটের আইনসভায় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির সিনেটপক্ষের চেয়ারম্যান এবং বাণিজ্য কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাসুদুর রহমান। আবাসন নির্মাণ, স্থানীয় সরকার ও সম্পত্তিকর তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। চলতি বছরের এপ্রিলে বাড়ির জমিতে অতিরিক্ত আবাসিক ইউনিট নির্মাণের ব্যয় কমানো, স্থানীয় ভূমি ব্যবহারবিধি কার্যকর করা এবং সম্পত্তিকর নির্ধারণের পদ্ধতি সংশোধনসংক্রান্ত চারটি বিল সিনেটে পাসের উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন তিনি।
স্ত্রী ইয়েলেনা ও তিন সন্তান নিয়ে ম্যানচেস্টারে বসবাস করেন মাসুদুর রহমান। তাঁর সিনেট কার্যালয়ের প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, সিনেটর হিসেবে পাওয়া বেতন নির্বাচনী এলাকার অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দান করেন তিনি। গভর্নরের বিদ্বেষমূলক অপরাধবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ এবং স্থানীয় শিক্ষা ও ব্যবসায়ী সংগঠনেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
শেখ রহমান ও মাসুদুর রহমানের এই সাফল্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি বাস্তব পথ তুলে ধরে। নতুন দেশে নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সমস্যা বোঝা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং জনসেবার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করেও নেতৃত্বে পৌঁছানো যায়। তাঁদের পুনর্নির্বাচন সেই পথচলার ধারাবাহিকতাকে আরও দীর্ঘ করল।
একসময় যে দেশে পড়াশোনা ও জীবিকার জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁরা, আজ সেই দেশের মানুষের পক্ষে আইন প্রণয়ন করছেন। বাংলাদেশ থেকে আসা এই দুই রাজনীতিক আমেরিকার জনজীবনে নিজেদের দায়িত্বের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁদের জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রা প্রবাসের নতুন প্রজন্মকে নিজের সম্ভাবনা আরও বড় করে দেখার সাহস দেয়।
তথ্যসূত্র: সিটি ইনসাইডার, ব্যালটপিডিয়া, জর্জিয়া স্টেট সিনেট







