ইইউর নতুন শুল্কনীতি: চীনের সস্তা ই-কমার্সে ধস, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সামনে সুবর্ণ সুযোগ

ঢাকা, ৩১ অক্টোবর – ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে অতি কম দামের পোশাক ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক ও হ্যান্ডলিং ফি আরোপের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিমান পরিবহনবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাভিয়েন’-এর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই নীতির ফলে চীনভিত্তিক অনলাইন বিক্রেতাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিকারকদের জন্য ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ইইউর নতুন শুল্ক ও ফি নীতি
অতি কম মূল্যের ই-কমার্স পণ্যের আগ্রাসন ঠেকাতে এবং বাজারে সমতা আনতে ইইউ বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে:
৩ ইউরো শুল্ক: গত ১ জুলাই থেকে কম মূল্যের আমদানিপণ্যের ওপর পার্সেলপ্রতি শ্রেণি বা ক্যাটাগরি অনুযায়ী ৩ ইউরো শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।
২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি: এর পাশাপাশি আগামী ১ নভেম্বর থেকে আমদানিপণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইইউ।
এই শুল্ক ও ফিয়ের কারণে ৫ ইউরোর টপস বা ১০ ইউরোর পোশাক সরাসরি কারখানা থেকে ভোক্তার কাছে পাঠানোর প্রচলিত লাভজনক মডেলটি হোঁচট খেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—৫ ইউরোর একটি পণ্যের ওপর ৩ ইউরো শুল্ক যুক্ত হলে শুধু শুল্কের কারণেই দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে চীন থেকে ইউরোপে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
সরবরাহ কৌশলে পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাশপথে পার্সেল কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে ইউরোপে চীনা পণ্যের বিক্রি সমপরিমাণ কমে গেছে। শুল্ক ও ফি এড়াতে অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এখন ব্যক্তিগত পার্সেল বা এয়ার কার্গো কমিয়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোর ভেতরে নিজস্ব গুদাম বা ওয়্যারহাউস স্থাপন করছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ পণ্য একসঙ্গে সমুদ্রপথে পাঠিয়ে পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি মডেল আর চীনের ই-কমার্স মডেল এক নয়। বাংলাদেশ সাধারণত বড় বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কন্টেইনার বা বড় চালানে পণ্য রপ্তানি করে থাকে, লাখ লাখ খুচরা পার্সেলের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে নয়। ফলে ইইউর নতুন শুল্কনীতির সরাসরি লক্ষ্য বাংলাদেশ না হলেও, এর পরোক্ষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে:
১. মূল্য ব্যবধান কমা: এতদিন শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে চীনা প্ল্যাটফর্মগুলো যে অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য বিক্রি করত, নতুন শুল্কনীতির কারণে সেই কৃত্রিম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আর থাকছে না।
২. গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্যতা: ইউরোপের ক্রেতারা যদি কেবল সর্বনিম্ন দামের পরিবর্তে পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, শ্রম অধিকার এবং কমপ্লায়েন্স বা বিধিবিধান মেনে উৎপাদনকে প্রাধান্য দেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ লাভবান হবে।
৩. প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা: বাংলাদেশের পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করা সম্ভব।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়িয়ে দেবে না। ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, লিড টাইম কমানো এবং কমপ্লায়েন্স বা আন্তর্জাতিক মান কঠোরভাবে ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
এনএন/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬







