মধ্যপ্রাচ্য

রিয়াদের আকাশে আতঙ্ক: সৌদি এয়ার ডিফেন্সে ধ্বংস ড্রোন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের কালো মেঘ

রিয়াদ, ৩১ অক্টোবর – সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আকাশসীমায় ফের ড্রোন হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। শনিবার রিয়াদ অঞ্চলে শত্রুপক্ষের ছোড়া একটি ড্রোন আঘাত হানার আগেই আকাশেই তা ধ্বংস করার আনুষ্ঠানিক দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই ঘটনায় নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানান, সৌদির শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) সময়মতো ড্রোনটি শনাক্ত করে এবং তা আকাশে ধ্বংস করে দেয়। ড্রোনটির খণ্ডাংশ নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লেও বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কৌশলগত কারণে বা তদন্তের স্বার্থে এই ড্রোনটি সরাসরি কোথা থেকে বা কারা উৎক্ষেপণ করেছে, সে বিষয়ে জোটের মুখপাত্র স্পষ্ট কিছু বলেননি।

সৌদি অর্থনীতি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আঘাত

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও অর্থনৈতিক অঞ্চল লক্ষ্য করে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ধারাবাহিকভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।

বিমানবন্দর বন্ধ ও আয়োজন বাতিল: সম্প্রতি রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের প্রাণঘাতী হামলার কারণে বিমানবন্দরটি টানা দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনও বাতিল করতে হয়।

ভিশন ২০৩০ ও অর্থনীতিতে ধাক্কা: রিয়াদের আকাশসীমায় ঘন ঘন হামলা এবং পর্যটন ও বাণিজ্যিক ইভেন্ট বাতিল হওয়ায় বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সৌদি আরব হাতে নিয়েছিল, তা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুদ্ধবিরতি ভাঙন ও মদিনায় হামলার গুঞ্জন

এর আগে শুক্রবার সৌদি জোটের মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম নগরী মদিনা শহর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। যদিও পরবর্তীতে এই দাবি অস্বীকার করেছে হুথি বিদ্রোহীরা।

মূলত চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুথিদের নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

১. ইরানি বিমান অবতরণ ও চুক্তি ভঙ্গ: গত জুলাইয়ে ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি আরবের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সানায় ইরানি একটি বিমানকে অবতরণের সুযোগ দেয় হুথিরা। এর ফলেই ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যায়।

২. লোহিত সাগরে হুথিদের দাপট: চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় হুথিরা। একপর্যায়ে বিদ্যুৎগতির অভিযান চালিয়ে তারা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সৌদির বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা জোরদার করে।

৩. সৌদির পাল্টা বিমান হামলা: এর জবাবে সৌদি আরব ও তার মিত্ররাও হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে ঘন ঘন বিমান হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে।

জাতিসংঘের উদ্বেগ ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

জাতিসংঘ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের নতুন এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে ১ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোনটি সফলভাবে ভূপাতিত করলেও যেভাবে উভয় পক্ষ সামরিক পদক্ষেপ বাড়াচ্ছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে এই অঞ্চল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এনএন/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language