ভারত-চীন সীমান্তে ফের উত্তাপ: অরুণাচলে মুখোমুখি দুই দেশের সেনা

নয়াদিল্লি, ২৮ অক্টোবর – ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্তরেখা (LAC) নিয়ে ফের বড় ধরনের উত্তেজনার খবর সামনে এসেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর। এর আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর প্রতিবেদনে এই সীমান্ত উত্তেজনার কথা প্রকাশ করা হলেও ভারতীয় সেনা তা অস্বীকার করেছিল। তবে আইটিবিপি প্রধানের এই বিরল প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের ভঙ্গুর শান্তি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সীমান্ত উত্তেজনার মূল বিষয়গুলো:
১. সেনার মুখোমুখি অবস্থান:
আগামী ৩১ অক্টোবর অবসরে যেতে চলা আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ সিং কাপুর এক সমাবেশে জানান, গত জুলাই থেকে অরুণাচলের বিভিন্ন স্থানে দুই দেশের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে এবং এই উত্তেজনা এখনও কাটেনি। বিশেষ করে তাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় চীনা সেনারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে ৬-৭ কিলোমিটারের মধ্যে তাঁবু গেড়ে অবস্থান নিয়েছে।
২. চীনের পরিকাঠামো নির্মাণ ও স্থানীয়দের বাধা:
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় চীন নতুন করে সড়ক, ভবন, হেলিপ্যাড ও জমি পরিষ্কার করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছে। এর ফলে স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত চারণভূমি, শিকারের এলাকা এবং পৈতৃক জমিতে প্রবেশাধিকার হারাচ্ছেন।
৩. প্রচলিত টহল বনাম চীনের আগ্রাসী কৌশল:
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, চীনা বাহিনী প্রচলিত টহল দেওয়ার ধরন থেকে সরে এলে মাঝেমধ্যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অন্যদিকে চীনের দাবি, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মেনেই নিজেদের ভূখণ্ডে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লির মতে, সীমান্তে এ ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা বছরে প্রায় ৩৮০ থেকে ৪৩০ বার ঘটে থাকে।
সামরিক আধুনিকায়ন ও ড্রোনের গুরুত্ব নিয়ে সতর্কবার্তা
আইটিবিপি প্রধান কাপুরের বক্তব্যে বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জামের আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বাহিনীর অনেক অস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউক্রেন ও ইরানের মতো উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে ছোট দেশ বা শক্তিগুলোও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরাশক্তিকে কঠোর চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। তাই চীনের সামরিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভারতকে দ্রুত প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করতে হবে।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও কংগ্রেসের আক্রমণ
সীমান্তে সেনাদের মুখোমুখি অবস্থানের খবর প্রকাশ্যে আসার পর নরেন্দ্র মোদী সরকারের নীরবতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।
জয়রাম রমেশের তোপ: কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, এই গুরুতর ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও তার পুরো প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের সময় প্রধানমন্ত্রীর “কেউ প্রবেশ করেনি” সংক্রান্ত বক্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সেই মন্তব্যের মূল্য আজকেও দেশকে দিতে হচ্ছে।
মল্লিকার্জুন খাড়গের উদ্বেগ: কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে ঘটনাটিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন সীমান্ত প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে দেশবাসীকে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে বহু আলোচনা চললেও অরুণাচলের এই নতুন মুখোমুখি অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলাতে ফের বড় ধাক্কা দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
এনএন/ ২৮ অক্টোবর ২০২৬







