অবশেষে বাতিল ২,৮১১ কোটির বিআরটি প্রকল্প: স্টেশন ভেঙে ৬ লেনের মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-গাজীপুর সড়ক

ঢাকা, ২১ অক্টোবর – দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রতীক্ষা, হাজার কোটি টাকার অপচয় আর ঢাকা-গাজীপুর রুটে যাতায়াতকারী লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় ভোগান্তির পর অবশেষে বাতিলই হয়ে গেল বহুল আলোচিত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। বিআরটি চলাচলের জন্য তৈরি বিশেষায়িত অবকাঠামো ও স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলে এখন সড়কটিকে দুই পাশে ৩টি করে মোট ৬ লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসিকে জরুরি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চার বিকল্পের চূড়ান্ত রূপ: কেন বাতিল হলো বিআরটি?
ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর বাস্তবায়নে চারটি বিকল্প নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে শেষ বিকল্পটি বেছে নেয় সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটি, ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিচালনাগত জটিলতার কারণে চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে সড়কটিকে সাধারণ যান চলাচলের উপযোগী করার সুপারিশ করেছিলেন। এরপরই এটি বাতিলের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়।
ইতোমধ্যে নির্দেশিত নতুন সিদ্ধান্তগুলো হলো:
অবকাঠামো অপসারণ: বিআরটি লেনের বিশেষ বিভাজক, নির্মিত স্টেশন ও সম্পর্কিত স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হবে।
৬ লেনের সাধারণ মহাসড়ক: বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি উভয় পাশে ৩ লেন করে মোট ৬ লেনের সাধারণ মহাসড়কে পরিণত হবে।
উড়ালসড়ক সম্প্রসারণ: প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি ২ লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা হবে।
কোম্পানি বিলুপ্তি: বিআরটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’ বন্ধ করে এর সকল কার্যক্রম সওজের অধীনে হস্তান্তরিত হবে।
১৪ বছরের দীর্ঘসূত্রতা ও ২,৮১১ কোটি টাকার খতিয়ান
২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিশেষ লেনে দ্রুত বাস চলাচলের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২,০৪০ কোটি টাকা।
তবে বাস্তবতার মুখে পড়ে প্রকল্পের সময়সীমা ৫ দফা বাড়ানো হলেও ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যন্ত প্রকল্পে খরচ হয়েছে ২,৮১১ কোটি টাকা।
প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে ব্যয় ৬,৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা অনুমোদন মেলেনি। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সেবাসংস্থার লাইন স্থানান্তর, নকশাগত ত্রুটি এবং বাস কেনার দরপত্র ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার চলন্ত সিঁড়িসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ অযত্নে নষ্ট ও চুরি হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদনের নির্দেশ
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি বন্ধ করতে হবে।
মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রথম অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে হালনাগাদ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অকার্যকর নির্মাণকাজের জাঁতাকলে পিষ্ট ঢাকা-গাজীপুর রুটের নিয়মিত যাত্রীরা আশা করছেন, অবাস্তব এই বিআরটি প্রকল্প ভেঙে সাধারণ মহাসড়ক তৈরির কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে অন্তত দীর্ঘদিনের যানজট ও ধুলাবালির ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে।
এনএন/ ২১ অক্টোবর ২০২৬







