
কানাডার আলবার্টা প্রদেশ কি দেশটির অংশ হয়েই থাকবে, নাকি স্বাধীন হওয়ার পথে এগোবে? অভিবাসীদের চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ কি সীমিত হবে? বিদেশি কর্মীদের সরকারি সেবা পেতে বাড়তি টাকা দিতে হবে? প্রদেশের চাকরিতে স্থানীয় বাসিন্দারা কি অগ্রাধিকার পাবেন? এমনই ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে আগামীকাল সোমবার, ১৯ অক্টোবর গণভোটে অংশ নিচ্ছেন আলবার্টার ভোটাররা। এই গণভোটের ফলাফল শুধু প্রদেশটির ভবিষ্যৎ নয়, কানাডার রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং লাখ লাখ অভিবাসীর জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির সরকার এই গণভোটের আয়োজন করেছে। মোট ১০টি প্রশ্নের মধ্যে পাঁচটি অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা ও ভোটাধিকার নিয়ে। অন্য চারটি প্রশ্নে রয়েছে বিচারক নিয়োগ, কানাডার সিনেট বিলুপ্তি এবং প্রাদেশিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়। শেষ প্রশ্নটি আলবার্টার স্বাধীনতা নিয়ে। যদিও প্রশ্নের ক্রম অনুযায়ী এটি দশম, ভোটারদের হাতে প্রথমেই স্বাধীনতাসংক্রান্ত ব্যালটটি দেওয়া হবে।
গণভোটের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো, আলবার্টা কানাডার অংশ হিসেবে থাকবে, নাকি স্বাধীনতার প্রশ্নে আরেকটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে? ভোটারদের এই দুটি বিকল্পের একটি বেছে নিতে হবে। দ্বিতীয় বিকল্পটি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেও আলবার্টা সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন হয়ে যাবে না। স্বাধীনতার জন্য পরবর্তী গণভোট, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
কানাডার অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রদেশ আলবার্টা। দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশটির একাংশের অভিযোগ, এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পায়, অথচ প্রদেশের স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পায় না। বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অটোয়ার সঙ্গে বিরোধ থেকেই স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়েছে।
তবে প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে নন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও কানাডার ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাধীনতার বিরোধীরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ, নাগরিকত্ব এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন তুলেছেন।
গণভোটের প্রথম পাঁচটি প্রশ্নে রয়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সেবা পাওয়ার যোগ্যতা এবং ভোটাধিকার। প্রাদেশিক সরকার চায়, আলবার্টায় কতজন অভিবাসী আসবেন এবং কোন পেশার মানুষ অগ্রাধিকার পাবেন, তা নির্ধারণে প্রদেশের আরও বেশি ক্ষমতা থাকুক। বিশেষ করে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ অভিবাসী গ্রহণ এবং নতুন কর্মসংস্থানে আলবার্টার বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে অভিবাসন কানাডার কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের যৌথ দায়িত্ব হলেও ভিসা, দেশে প্রবেশের অনুমতি এবং স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা প্রদানের প্রধান ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। প্রাদেশিক নমিনি কর্মসূচির মাধ্যমে আলবার্টা দক্ষ অভিবাসীদের মনোনীত করতে পারে। কিন্তু এককভাবে জাতীয় অভিবাসননীতি পরিবর্তন করতে পারে না।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই আলবার্টার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ লাখ। এর মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির অস্থায়ী বাসিন্দা রয়েছেন।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, আবাসন ও সামাজিক সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসননীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, সরকারি সেবার সংকটের জন্য শুধু অভিবাসীদের দায়ী করা যায় না। চিকিৎসক ও শিক্ষকের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সরকারি পরিকল্পনার দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তা ছাড়া অভিবাসীরা কর প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমিকসংকট দূর করতেও ভূমিকা রাখছেন।
গণভোটে প্রস্তাব করা হয়েছে, কানাডীয় নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং আলবার্টা সরকারের অনুমোদিত অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। তবে অস্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে কারা এই অনুমোদন পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
আরেকটি প্রশ্নে অস্থায়ী বাসিন্দা ও তাঁদের পরিবারের জন্য সরকারি চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা গ্রহণের বিপরীতে ফি বা প্রিমিয়াম আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। প্রিমিয়ার স্মিথ এর আগে স্বাস্থ্যসেবার জন্য বছরে জনপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ কানাডীয় ডলার নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে গণভোটে নির্দিষ্ট কোনো অর্থের উল্লেখ নেই।
এ ছাড়া অস্থায়ী অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাদেশিক সামাজিক সহায়তা পাওয়ার আগে অন্তত ১২ মাস আলবার্টায় বসবাসের শর্ত আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী অনেক বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আলবার্টার সরকারি স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পান। তাঁদের সন্তানরাও প্রচলিত নিয়মে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সেই সুবিধাগুলো কতটা পরিবর্তিত হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
গণভোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাদেশিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগে কানাডীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। বর্তমানে শুধু কানাডীয় নাগরিকেরাই ভোট দিতে পারেন। তবে ভোট দেওয়ার সময় পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণ দেখালেই চলে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ভোটারদের কানাডীয় পাসপোর্ট, নাগরিকত্বের সনদ কিংবা অন্য গ্রহণযোগ্য নথি দিয়ে নাগরিকত্বও প্রমাণ করতে হবে।
অন্য প্রস্তাবগুলো হলো, প্রদেশের উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা, কানাডার নির্বাচিত নয় এমন সিনেট বিলুপ্ত করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো খাতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেও সংশ্লিষ্ট অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রাদেশিক এখতিয়ারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনের বিরোধ হলে প্রাদেশিক আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এসব পরিবর্তনের জন্য কানাডার সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
গণভোটকে ঘিরে বিশেষ উদ্বেগে রয়েছেন অস্থায়ী বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। কানাডায় বৈধভাবে বসবাস ও কর প্রদান করলেও নতুন নিয়মে সরকারি সেবা পেতে তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
আলবার্টার অভিবাসী সহায়তাকারী সংগঠনগুলোর কাছেও অনেকেই জানতে চাইছেন, সম্ভাব্য পরিবর্তন তাঁদের চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ বসবাসের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অস্থায়ী অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাঁদের অধিকাংশেরই এই গণভোটে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই।
গণভোটে অংশ নিতে পারবেন আলবার্টায় বসবাসরত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী কানাডীয় নাগরিকেরা। ভোটগ্রহণ শেষে প্রথমে স্বাধীনতাসংক্রান্ত প্রশ্নের ব্যালট গণনা করা হবে। এরপর বাকি নয়টি প্রশ্নের ভোট গণনা চলবে। প্রাথমিক ফল ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যাবে। আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হবে ২৯ অক্টোবর।
তবে গণভোটের ফল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। কোনো প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। কয়েকটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা ও সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। নতুন আইন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে।
ফলে ১৯ অক্টোবরের গণভোটে শুধু কয়েকটি নীতিগত প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, বোঝা যাবে আলবার্টার মানুষ ভবিষ্যতে তাঁদের প্রদেশকে কোন পথে দেখতে চান। কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক, অভিবাসীদের অধিকার এবং প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, এই গণভোট তার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: Elections Alberta, Government of Alberta ও Statistics Canada







