মধ্যপ্রাচ্য

সৌদির বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় আরও হামলার হুমকি হুতিদের

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি

সানা,১৫ অক্টোবর- সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। বুধবার এক বিবৃতিতে এসব স্থাপনাকে নিজেদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। এর আগে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই হামলায় ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের জবাব দিতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে হুতিরা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।

গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার ঘটনা বেড়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হন।

মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তরে হামলার পর সেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে অবগত তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভবনটির কয়েকটি তলায় আগুন লাগে। তবে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, সেখানে সীমিত পরিসরে আগুনের ঘটনা ঘটেছে।

সূত্রগুলোর মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, হামলার পরও আরামকোর কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি কোম্পানিটি।

ক্রমবর্ধমান সংঘাত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং সৌদি আরবকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

হুতিরা জানিয়েছে, ইয়েমেনের যুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে সৌদি আরব সমর্থন দেওয়ায় তারা দেশটিতে হামলা চালাচ্ছে। গত মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

বুধবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। একই দিন সৌদি রাজধানীতে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রিয়াদে সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি সম্পর্কে সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। পরে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। তবে বিস্ফোরণের শব্দের প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষও কোনো মন্তব্য করেনি।

বিস্ফোরণের কারণ জানতে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

বুধবারের বিবৃতিতে হুতিরা দাবি করেছে, ধাহরানে আরামকোর স্থাপনা, রিয়াদের বিমানবন্দর এবং সৌদি রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন কোম্পানি, বেসামরিক নাগরিক এবং তেল স্থাপনাগুলোর কর্মীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে কোম্পানিটির গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন কেন্দ্র রয়েছে। সেখান থেকে স্থল ও সমুদ্রের তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার এবং তেল রপ্তানির টার্মিনালসহ বিস্তৃত অবকাঠামো পরিচালনা ও তদারক করা হয়।

গত এক সপ্তাহে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চারবার হামলার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে গত শনিবারের হামলাটি গত এক দশকে সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা ছিল। ওই ঘটনার পর বিমানবন্দরটি আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সৌদি আরবগামী একাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে বিভিন্ন বিমান সংস্থা।

ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। ওই সময় হুতিরা দেশটির রাজধানী সানা দখল করে নিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে রিয়াদ।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এর ফলে চলতি বছর পর্যন্ত ভঙ্গুর শান্তি বজায় ছিল।

গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব আবারও সামরিক অভিযান শুরু করে।

বুধবার আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে লড়াই তীব্র হওয়ায় যুদ্ধাহত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে দেশটির হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

এদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, হুতি যোদ্ধাদের অবরোধের কারণে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা তাইজ শহরে জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি মাসের শুরুতে হুতিরা শহরটি ঘিরে ফেলে।

ডব্লিউএফপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাইজে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছয় লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না সংস্থাটি ও এর সহযোগীরা। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই লাখের বেশি নারী ও শিশু রয়েছেন।

এস এম/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language