ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, সংবাদমাধ্যমের তথ্য যাচাই নিয়ে প্রশ্ন

দিল্লি,১৫ অক্টোবর- ভারতে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা (এসআইআর) ঘিরে ব্যাপক আন্দোলন চলছে। এই বিতর্কে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংখ্যাগত তথ্য যাচাইয়ে সাংবাদিকদের দুর্বলতা এবং চটকদার শিরোনাম তৈরির প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করছে বলে মনে করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক রবি জগন্নাথন।
তার মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভুল থাকলেও তথ্য বিশ্লেষণ না করে বড় বড় সংখ্যার প্রচার চালিয়ে যাওয়া সত্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আরও বড় সংকট তৈরি করছে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিকের মতে, গণতন্ত্রে স্বৈরশাসনের তুলনায় তথ্য পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। তবে সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নির্ভর করে এর উৎস ও যাচাইয়ের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। এর সঙ্গে টেলিভিশন উপস্থাপক ও সংবাদপত্রগুলোর ক্লিকবেইট শিরোনাম তৈরির প্রতিযোগিতা যুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত তথ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও ব্যবহারকারীদের একই ধরনের মতামতের মধ্যে আটকে রাখে। ফলে প্রকৃত তথ্যের চেয়ে আবেগ ও জোরালো প্রচারণা মানুষের মতামতকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
রবি জগন্নাথনের মতে, সাংবাদিকতার শিক্ষানবিশদের প্রায়ই কোনো ঘটনার ‘অ্যাঙ্গেল’ বা বিশেষ দৃষ্টিকোণ খুঁজে বের করতে বলা হয়। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে পুরো বাস্তবতার কেবল একটি সীমিত অংশই সামনে আসে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর পরিবেশে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে কোনো ঘটনা নিয়ে নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে ২০১৪-১৫ সালে ভারতের গির্জাগুলোতে কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর খ্রিষ্টানদের ওপর ধারাবাহিক হামলার যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, তা উল্লেখ করেছেন জগন্নাথন। তার দাবি, পরে মন্দির ও গুরুদ্বারেও একই ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটার তথ্য সামনে আসার পর সেই বয়ান দুর্বল হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়েও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি ছিল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সংখ্যা যাচাইয়ের দুর্বলতা কীভাবে মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করে, তা বোঝাতে লেখক ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার আলোচিত সংখ্যাটির উদাহরণ দিয়েছেন।
তার মতে, এই সংখ্যা বারবার প্রচার করা হয়েছে বলে অনেকেই এর অর্থ ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করেই একে ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রভাবকে ‘অ্যাঙ্করিং ইফেক্ট’ বলা হয়। কোনো বিষয়ে শুরুতেই একটি বড় সংখ্যা সামনে এলে পরবর্তী আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ সেই সংখ্যাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে পারে। একইভাবে, সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা মানুষের সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য লাভের তুলনায় বেশি প্রভাবিত করে। ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্বেগ বেশি জোরালোভাবে প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, যাদের নাম বাদ পড়েনি, তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া অতীতের কয়েকটি ঘটনাও তুলে ধরেছেন জগন্নাথন। ২০০৮ সালে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিলাম না হওয়ায় ভারতের তৎকালীন মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক বিনোদ রাই সরকারি কোষাগারের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি রুপি বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি আরও কয়েকটি কম অঙ্কের হিসাব দিলেও সবচেয়ে বড় সংখ্যাটিই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। জগন্নাথনের মতে, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবকে প্রকৃত ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা পরবর্তী সময়ে নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছিল।
কৃষক আত্মহত্যার পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখেছেন লেখক। তার উল্লেখ করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক দশকে ভারতে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন।
তবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই সংখ্যাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত, সেই প্রশ্নও তুলেছেন জগন্নাথন। তার মতে, মানবিক বিপর্যয়ের গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি পরিসংখ্যানের যথাযথ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করাও জরুরি।
ভারতে পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ—এমন তথ্যও উল্লেখ করেছেন স্বরাজ্য পত্রিকার সাবেক এই সম্পাদকীয় পরিচালক। তার মতে, পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হওয়াও দেখায় যে মানুষ অনেক সময় বাস্তবতার সব দিক বিবেচনা না করে আগে থেকে তৈরি হওয়া ধারণার সঙ্গে মেলে, এমন তথ্যকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
এসআইআর বিতর্কে জগন্নাথনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখকে মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখকে সম্ভাব্য স্থায়ী অভিবাসী এবং এক কোটিকে একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় তিন কোটি মানুষ জরিপের সময় নিজ নিজ ঠিকানায় উপস্থিত ছিলেন না।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই লেখকের দাবি, মৃত্যু ও অভিবাসনের জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে এসব সংখ্যা পুরোপুরি অসংগত নয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে কারও নাম বাদ পড়েনি।
তার ধারণা, সারা দেশে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৫০ লাখের কম হতে পারে। বাদ পড়া ভোটারদের আপিলের মাধ্যমে নাম পুনর্বহালের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার মতে, প্রকৃত সমস্যা হলো, বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত করা এবং সেগুলো সংশোধনের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
জগন্নাথনের মতে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলার চেয়ে প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা এবং ভুল সংশোধনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা বেশি জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিসংখ্যান বোঝার দক্ষতা বাড়ানো, সংখ্যার প্রেক্ষাপট যাচাই করা এবং তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতা সত্য অনুসন্ধানের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করছে।
এস এম/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬







