
টরন্টোর মেয়র নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, অলিভিয়া চাও ও ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের লড়াই ততই কাছাকাছি হয়ে উঠছে। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত Liaison Strategies-এর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, পছন্দের প্রার্থী ঠিক করে ফেলেছেন বা কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছেন এমন ভোটারদের মধ্যে অলিভিয়া পেয়েছেন ৫১ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪৬ শতাংশ সমর্থন। অন্য প্রার্থীদের সমর্থন ৩ শতাংশ। দুই প্রধান প্রার্থীর ব্যবধান এখন ৫ শতাংশ পয়েন্ট।
জরিপটি চালানো হয় ৮ ও ৯ অক্টোবর, টরন্টোর এক হাজার প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দার ওপর। ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পুরো নমুনার margin of error প্লাস-মাইনাস ৩.১ শতাংশ পয়েন্ট, ২০ বারের মধ্যে ১৯ বার। তবে যে উপদলের মধ্যে অলিভিয়া ৫১ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪৬ শতাংশ পেয়েছেন, সেই decided and leaning voters-এর ক্ষেত্রে margin of error কিছুটা বেশি।
সব অংশগ্রহণকারীকে বিবেচনায় নিলে অলিভিয়ার সমর্থন ৪২ শতাংশ, ব্র্যাডফোর্ডের ৩৮ শতাংশ। অন্য প্রার্থীদের সমর্থন ৩ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থাৎ নির্বাচনের শেষ দুই সপ্তাহে এখনও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার রয়েছেন, যাঁদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। Liaison-এর প্রধান ডেভিড ভ্যালেন্টিনও বলেছেন, কোনো পক্ষেরই এই ফলকে চূড়ান্ত পরিস্থিতি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সর্বশেষ জরিপে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে বড় পার্থক্য। ভাড়াটিয়াদের মধ্যে অলিভিয়া এগিয়ে ৫৭ শতাংশ বনাম ব্র্যাডফোর্ডের ৪০ শতাংশ। বিপরীতে বাড়ির মালিকদের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ড পেয়েছেন ৫০ শতাংশ এবং অলিভিয়া ৪৫ শতাংশ। টরন্টোর আবাসন সংকট, ভাড়া এবং সম্পত্তি কর যে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দেও ভিন্ন প্রভাব ফেলছে, এই ফল সেই বিভাজনের একটি ছবি তুলে ধরে।
নারী ও পুরুষ ভোটারের মধ্যেও পার্থক্য বেশ বড়। নারী ভোটারদের মধ্যে অলিভিয়া ৫৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন, ব্র্যাডফোর্ড ৩৯ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে চিত্র উল্টো, ব্র্যাডফোর্ড ৫৩ শতাংশ এবং অলিভিয়া ৪৩ শতাংশ। বয়সভিত্তিক হিসাবেও অলিভিয়া ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এগিয়ে ৫৪ বনাম ৪২ শতাংশে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ভোটারদের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ড এগিয়ে ৫১ বনাম ৪৬ শতাংশে।
এলাকাভিত্তিক ফলও দুই প্রার্থীর আলাদা শক্তির জায়গা দেখাচ্ছে। Downtown-এ অলিভিয়া ৫৭ শতাংশ বনাম ব্র্যাডফোর্ডের ৩৯ শতাংশ এবং North York-এ অলিভিয়া ৫০ বনাম ৪৬ শতাংশে এগিয়ে। অন্যদিকে Scarborough-তে ব্র্যাডফোর্ড ৫০ বনাম অলিভিয়ার ৪৭ শতাংশ এবং Etobicoke-তে তাঁর ব্যবধান আরও বড়, ৫৯ বনাম ৩৮ শতাংশ। তবে Liaison নিজেই সতর্ক করেছে, এসব আঞ্চলিক উপনমুনা ছোট হওয়ায় ফলাফলে ওঠানামা বেশি হতে পারে।
অলিভিয়ার মেয়র হিসেবে কাজের মূল্যায়নেও ভোটাররা প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত। সর্বশেষ Liaison জরিপে ৫২ শতাংশ তাঁর কাজকে অনুমোদন করেছেন, ৪৩ শতাংশ অসন্তুষ্ট এবং ৫ শতাংশ নিশ্চিত নন। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত একই প্রতিষ্ঠানের আগের জরিপে তাঁর approval ছিল ৫০ শতাংশ এবং disapproval ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তাঁর কাজের অনুমোদনে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও ভোটের লড়াই এখনও ঘনিষ্ঠ।
আগের কয়েকটি জরিপের সঙ্গে তুলনা করলে নির্বাচনী লড়াইয়ের ওঠানামাটিও বোঝা যায়। ৬ অক্টোবর Forum Research-এর জরিপে অলিভিয়া ৪৬ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন, ব্যবধান ছিল চার পয়েন্ট। ওই জরিপে ১,৬০৪ জন টরন্টোবাসী অংশ নেন এবং margin of error ছিল প্লাস-মাইনাস ২.৪৫ শতাংশ পয়েন্ট।
এরপর ৯ অক্টোবর প্রকাশিত Mainstreet Research-এর জরিপে দুই প্রার্থীর ব্যবধান নেমে আসে ২.৯ শতাংশ পয়েন্টে। সেই জরিপে অলিভিয়া ৪৭.২ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪৪.৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। এখন Liaison-এর জরিপে ব্যবধান আবার পাঁচ পয়েন্ট দেখা যাচ্ছে। তবে একটি জরিপের সঙ্গে আরেকটির সংখ্যাগত পরিবর্তনকে সরাসরি ভোটারদের মত বদলের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জরিপ প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি, নমুনা, সময় এবং প্রশ্ন করার ধরন এক নয়।
শহরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও ভোটারদের মত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। Liaison-এর জরিপে ৪৭ শতাংশ বলেছেন টরন্টো সঠিক পথে এগোচ্ছে, আর ৪৫ শতাংশ মনে করেন শহর ভুল পথে যাচ্ছে। ফলে মেয়র নির্বাচনটি শুধু দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; শহর পরিচালনার বর্তমান দিকনির্দেশনা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে গভীর মতভেদ রয়েছে।
জননিরাপত্তা নির্বাচনের আরেকটি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। Canada Pulse Insights-এর সাম্প্রতিক জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয় ও affordability-এর পর অপরাধ, পুলিশিং ও জননিরাপত্তাকে ভোটাররা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই জরিপে ৩৫ শতাংশ টরন্টোবাসী জানিয়েছেন, রাতে নিজেদের পাড়ায় হাঁটতে তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন না।
এদিকে বাইক লেনও আবার নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত আরেক জরিপে ৬২ শতাংশ টরন্টোবাসী প্রধান সড়ক থেকে কিছু বাইক লেন সরানোর প্রাদেশিক উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। বাইক লেন নিয়ে অলিভিয়া ও ব্র্যাডফোর্ডের অবস্থানের পার্থক্য আগের বিতর্কগুলোতেও সামনে এসেছে।
অলিভিয়া চাওয়ের পক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। Toronto & York Region Labour Council, TTC কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ATU Local 113, নির্মাণশ্রমিকদের LiUNA Local 183 এবং Automotive Parts Manufacturers Association তাঁর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ব্র্যাডফোর্ডের পক্ষে A Better City Toronto সক্রিয় প্রচার চালাচ্ছে এবং অলিভিয়া চাওয়ের প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করছে।
নির্বাচনী উত্তেজনার আরেকটি বড় ইঙ্গিত মিলেছে আগাম ভোটে। ৬ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫০ জন ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন, যা টরন্টোর পৌর নির্বাচনের ইতিহাসে রেকর্ড। ২০২২ সালে আগাম ভোট দিয়েছিলেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৯১১ জন এবং ২০১৪ সালের আগের রেকর্ড ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪৭। দুই প্রধান প্রার্থীর প্রচার শিবিরই এই বিপুল উপস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে ইতিবাচক বলে ব্যাখ্যা করেছে, যদিও আগাম ভোটের ফল থেকে কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন তা জানা যায় না।
মূল ভোট ২৬ অক্টোবর। ফলে হাতে সময় এখন দুই সপ্তাহেরও কম। সর্বশেষ জরিপে অলিভিয়া এগিয়ে থাকলেও ব্র্যাডফোর্ডের সঙ্গে ব্যবধান এখনও এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি, সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের পছন্দ এবং শেষ দিকের প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জরিপগুলো কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জনমতের ছবি, নির্বাচনের ফল নয়। সেই কারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আগামী কয়েক দিনের নতুন জরিপ, প্রচারের শেষ পর্যায়ের বার্তা এবং ভোটারদের বাস্তব উপস্থিতি।
তথ্যসূত্র: Liaison Strategies; Mainstreet Research; Forum Research; CityNews Toronto; TorontoToday







