সানায় ‘বিশেষ অভিযান’ চালাচ্ছে সৌদি জোট, বেসামরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ

রিয়াদ, ১৩ অক্টোবর – মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণাঙ্গনে এবার বড় ধরনের সামরিক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানায় এক রহস্যময় ও বড় ধরনের ‘বিশেষ অভিযান’ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। যেকোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে জোটের সামরিক বিমান ও রণতরী। বড় ধরণের রক্তপাত ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে নির্দিষ্ট এলাকার বেসামরিক নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য চরম হুঁশিয়ারি বা সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন التحالف বা সামরিক জোটের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে এই সামরিক পদক্ষেপের কথা নিশ্চিত করেছেন।
কিন্তু হঠাৎ কেন সানায় এত বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি? কী লুকিয়ে আছে এই ‘বিশেষ অভিযান’-এর পেছনে?
রহস্যে ঘেরা সামরিক সতর্কবার্তা: ঠিক কী ঘটছে সানায়?
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সফল সামরিক অপারেশন পরিচালনার স্বার্থেই সাধারণ মানুষকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো—ঠিক সানার কোন এলাকায় এই হামলা চালানো হবে, অভিযান কখন শুরু হবে কিংবা এর মূল লক্ষ্য কী (কোন নির্দিষ্ট হুথি কমান্ডার নাকি ড্রোন/ক্ষেপণাস্ত্র ডিপো)—তার বিস্তারিত কিছুই প্রকাশ করেনি জোট।
হঠাৎ এই অস্পষ্ট অথচ বড় ধরনের সতর্কবার্তায় পুরো সানা শহরজুড়ে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। বাসিন্দারা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ সানার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মুহূর্তের মধ্যেই সাধারণ ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
কেন আবার সানায় আগুনের লেলহান শিখা?
ইয়েমেন সীমান্তে বেশ কিছুদিন ধরে চলতে থাকা অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে এই অভিযানটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের পেছনে ৩টি প্রধান কৌশলগত কারণ থাকতে পারে:
হাই-ভ্যালু টার্গেট ও হুথি নেতৃত্বকে আঘাত:
সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, জোটের গোয়েন্দা সংস্থা সানায় হুথি বিদ্রোহীদের শীর্ষ কোনো সামরিক কমান্ডার, ড্রোন কন্ট্রোল সেন্টার অথবা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গোপন আস্তানার সুনির্দিষ্ট খবর পেয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকা খালি করার নির্দেশ এটাই ইঙ্গিত করে যে, সেখানে পিন-পয়েন্ট প্রিসিশন (Precision Strike) চালানো হবে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবিক ইস্যু সামলানো:
অতীতে সানায় বিমান হামলায় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল সৌদি জোট। বেসামরিক নাগরিকদের আগেই সরে যেতে বলে জোট বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আইনি ও মানবিক দায় হালকা করার কৌশল নিয়েছে।
লোহিত সাগরে হুথিদের ক্ষমতা দমানোর চেষ্টা:
লোহিত সাগরে বিশ্ব বাণিজ্যের পথ সুগম করতে ও হুথিদের ড্রোন ক্ষমতার মূল কেন্দ্র গুড়িয়ে দিতেই সানা শহরের ভেতরে থাকা গোপন অস্ত্রাগারগুলোকে এখন টার্গেট করছে যৌথ সামরিক বাহিনী।
“যখন কোনো সামরিক জোট সম্পূর্ণ কৌশলগত গোপনীয়তা বজায় রেখে সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বলে, তখন বুঝতে হবে সেই অভিযানের স্কেল বা ব্যাপ্তি সাধারণ কোনো বিমান হামলার চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক হতে যাচ্ছে।” — একজন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞ।
বিশ্বরাজনীতি ও সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ কী?
ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং তৈরি হয়েছে বিশ শতকের অন্যতম বড় মানবিক সংকট। সানায় এই নতুন ‘বিশেষ অভিযান’ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খাবে।
সানার সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আদৌ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দাবানলে পুড়বে?
এনএন/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬







