৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও ভাঙবে না সদর দপ্তর: দুর্যোগ সামলাতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অভাবনীয় প্রস্তুতি

ঢাকা, ০২ অক্টোবর – একটি তীব্র ভূমিকম্প কিংবা মেগা ডিজাস্টার (মহাবিপদ) মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে গোটা একটি শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। যদি দুর্যোগের উৎপত্তিস্থলেই ধসে পড়ে মূল উদ্ধারকারী সংস্থার কার্যালয় বা যোগাযোগ ব্যবস্থা, তবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? এই আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকে সামনে রেখে এবার অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
ভূমিকম্পে ফায়ার স্টেশনের নিজস্ব অবকাঠামো কিংবা প্রধান কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উদ্ধার তৎপরতা যেন এক সেকেন্ডের জন্যও থমকে না যায়—সেজন্য পুরো বাহিনী তাদের জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং কমান্ড কাঠামোয় এনেছে ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ।
ঢাকায় বিশেষ ইউনিট ও কমান্ড কাঠামোর পরিবর্তন
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ:
পূর্বাচলে বিশেষ রেসকিউ টিম: ঢাকার পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ রেসকিউ টিম সর্বদা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সরঞ্জাম বিকেন্দ্রীকরণ: ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার সরঞ্জাম ঢাকাসহ আশপাশের ৪১টি কৌশলগত পয়েন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রধান ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আঞ্চলিক সরঞ্জাম দিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়।
ঢাকার বাইরে ১০০ স্টেশনের ব্যাকআপ: বড় দুর্যোগের সময় ঢাকাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তার জন্য ঢাকার বাইরের ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে অল-টাইম রেডি বা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কমান্ড সেন্টার মিরপুরে স্থানান্তর: পুরান ঢাকার বর্তমান সদর দপ্তর ভবনটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দুজন পরিচালকের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কমান্ড কর্মকর্তাদের অলরেডি মিরপুরে অফিস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৮ মাত্রার ভূমিকম্পসহনীয় নতুন সদর দপ্তর ও প্রযুক্তি
ভবিষ্যতের বড় ধরনের দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে জাইকার (JICA) অর্থায়ন ও সহায়তায় ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে অতি-আধুনিক সদর দপ্তর ভবন।
‘বেজ আইসোলেশন প্রযুক্তি’: এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা নতুন ভবনটি রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পেও অক্ষত থাকবে। ২০২৮ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হলে ফায়ার সার্ভিসের মূল অধিদপ্তর পুরান ঢাকা থেকে এখানে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হবে।
ব্যাকআপ যোগাযোগ ও এয়ার সাপোর্ট
মেগা ডিজাস্টারের পরপরই সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এই চ্যালেঞ্জ কাটাতে:
বিকল্প রেডিও যোগাযোগ: অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরাব) সহায়তায় বিকল্প ওয়ারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থার সফল মহড়া সম্পাদন করা হয়েছে।
হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযান: ভূমিকম্পে সড়কপথ অবরুদ্ধ হয়ে গেলে উদ্ধারকারীদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহারের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের মতামত
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, অতি ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় সরু গলি, দীর্ঘ যানজট এবং ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী যানবাহনের পৌঁছানো এবং গ্যাস বা বিদ্যুতের আগুন সামলানোই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে জনবল ও রেসকিউ টিমের বিকেন্দ্রীকরণ জীবন রক্ষায় গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানান, অবকাঠামোগত প্রস্তুতির পাশাপাশি সব সংস্থার সমন্বিত মহড়া নিয়মিত বজায় রাখা আবশ্যক।
এনএন/ ০২ অক্টোবর ২০২৬







