আইফোনের লোভে অপ্রতিম হত্যা: ৭ দিন আগে কষা ছক, তিন আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

কুমিল্লা, ২৮ সেপ্টেম্বর – দামি আইফোনে ছবি তোলা আর টিকটক ভিডিও বানানোর আড়ালে তৈরি হওয়া ‘অসম বন্ধুত্বই’ কাল হলো ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের জন্য। মাত্র একটি আইফোন হাতিয়ে নেওয়ার লোভে টানা ৭ দিন ধরে নীল নকশা সাজিয়ে নির্জন পাহাড়ে ডেকে নেওয়া হয় কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের এই সপ্তম শ্রেণির ছাত্রকে। এরপর কোদালের হাতল দিয়ে পিটিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
আদালতে দেওয়া তিন আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে পূর্বপরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের শিউরে ওঠার মতো বিস্তারিত তথ্য।
আইফোনের লোভ ও ৭ দিন আগের ‘ডেডলি প্ল্যান’
মামলার তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৫-৬ মাস আগে মোটরসাইকেলে ঘোরঘুরি ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে আসামিদের সঙ্গে পরিচয় হয় অপ্রতিমের। অপ্রতিমের ব্যবহৃত দামি আইফোনটির ওপর শুরু থেকেই নজর ছিল প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং ভুক্তভোগীর বাবার দোকানে কাজ করা এক কিশোরের।
ঘটনার এক সপ্তাহ আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে তুহিন ও ওই কিশোর অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা কষে। পরিকল্পনা ছিল, আইফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে তা বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হবে।
ছবি তোলার বাহানায় পাহাড়ে ডেকে নেওয়া ও হামলা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন পাহাড়ে ডেকে নেওয়া হয়। পাহাড়ে চারজন মিলে আড্ডা দেওয়ার একপর্যায়ে দোকানে কর্মরত কিশোরটি ব্যবহারের কথা বলে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি নেয় এবং ফেরত না দিয়ে তুহিনের কাছে হস্তান্তরিত করে। অপ্রতিম ফোন ফেরত চাইতে গেলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। তুহিন প্রথমে তাকে থাপ্পড় মারেন। একপর্যায়ে তুহিন পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় পরপর আঘাত করেন। রক্তে ভেসে গিয়ে অপ্রতিম ঢলে পড়লে অপ্রতিমের নিশ্চিত মৃত্যু ঘটিয়ে সটকে পড়ে ঘাতকরা।
পরদিন সানন্দা গ্রামের পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যার পর খোঁজার ‘নাটক’ ও ফেসবুকে শোকের পোস্ট
ঘটনা ঘটানোর পর অপরাধীরা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে নির্দোষ সাজতে শুরু করে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পরদিন আসামিদের একজন পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাকে খোঁজার ভান করে, আবার দুজন অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ফেসবুকে ‘গভীর শোক’ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়!
তবে সিসিটিভি ফুটেজ ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে পুলিশ দ্রুত মূল অভিযুক্ত তুহিনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় অন্য দুই কিশোর এবং তথ্য গোপন করার অপরাধে তুহিনের বন্ধু সিয়ামকে (১৯)।
চিত্রধারণের আমন্ত্রণে বাসা থেকে বেরিয়ে লাশ হওয়া অপ্রতিমের স্বজন, সহপাঠী ও পুরো কুমিল্লাবাসী এখন এই নৃসংস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রহর গুনছে।
এনএন/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬







