সম্পাদকের পাতা

মার্কিন ভিসায় এবার নতুন কড়াকড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

নজরুল মিন্টো

এক সময় মার্কিন ভিসার সাক্ষাৎকার বলতে বোঝাত পাসপোর্ট, চাকরির কাগজ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আমন্ত্রণপত্র কিংবা সফরের কারণ নিয়ে প্রশ্নোত্তর। এখন সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছে আরেকটি জগৎ। ফেসবুকে কী লেখা হয়েছে, ইনস্টাগ্রামে কী শেয়ার করা হয়েছে, এক্সে কী মন্তব্য আছে, লিংকডইনে কী পরিচয় দেওয়া হয়েছে, এমনকি ইন্টারনেটে একজন আবেদনকারীর নামে আর কী পাওয়া যায়, সেসবও ভিসা যাচাইয়ের অংশ হয়ে উঠছে।

আগামী ১ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তিন শ্রেণির নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীর অনলাইন উপস্থিতি আরও কড়াভাবে যাচাই শুরু করছে। নতুন তালিকায় রয়েছে বিদেশি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকর্মীদের I visa, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের TN visa এবং তাঁদের স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীল সন্তানদের TD visa। এসব ভিসার আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব প্রোফাইলের privacy setting ‘public’ বা ‘open’ রাখার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

মার্কিন ভিসার আবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য নেওয়া শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০১৯ সালের ৩১ মে থেকে অধিকাংশ ইমিগ্র্যান্ট ও নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীর কাছে আগের পাঁচ বছরে ব্যবহার করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের account name বা handle চাওয়া শুরু করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। অর্থাৎ Facebook, Instagram, X বা তালিকাভুক্ত অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে আবেদনকারী কোন নামে সক্রিয় ছিলেন, সেই তথ্যও আবেদনপত্রের অংশ হয়ে যায়। পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছিল, পরিচয় নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা যাচাই আরও জোরদার করাই এর উদ্দেশ্য। তবে account name বা handle জানানো আর পুরো অ্যাকাউন্ট সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বড় দিকটি এখানেই।

২০২৫ সালের জুনে F, M ও J শ্রেণির শিক্ষার্থী ও exchange visitor visa আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি ব্যাপকভাবে যাচাই শুরু হয়। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট public রাখতে বলা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় H-1B ও সংশ্লিষ্ট H-4 আবেদনকারী। এরপর ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে A-3, নির্দিষ্ট C-3, G-5, H-3, নির্দিষ্ট H-4, K-1, K-2, K-3, Q, R-1, R-2, S, T ও U শ্রেণির আবেদনকারীরাও এই নিয়মের আওতায় আসেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে I, TN ও TD।

পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় কোন পোস্ট বা কোন ধরনের মন্তব্য কীভাবে বিচার করা হবে, তার বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, ভিসা যাচাইয়ের সময় পাওয়া সব ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হবে। আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন কি না, সেটিও বিবেচনা করবেন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে যে ভিসার জন্য আবেদন করা হয়েছে, আবেদনকারী তার শর্ত পূরণ করেন কি না এবং যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সেই ভিসার নিয়ম মেনে চলার বিশ্বাসযোগ্য উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তাও দেখা হবে।

আগের শিক্ষার্থী ও exchange visitor visa-সংক্রান্ত নির্দেশনা এই যাচাই কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তার কিছু ধারণা দেয়। ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তাদের পাঠানো নির্দেশনায় শুধু social media নয়, আবেদনকারীর পুরো অনলাইন উপস্থিতি খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইনে প্রকাশিত তথ্য এবং কর্মকর্তাদের নাগালে থাকা অন্যান্য উৎসও ছিল। Reuters জানিয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য এবং নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি সমর্থনের মতো বিষয়ও খোঁজা হচ্ছিল।

তবে ১ অক্টোবর থেকে I, TN ও TD ভিসার ক্ষেত্রে কোন ধরনের অনলাইন তথ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, নতুন ঘোষণায় তার বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে আগের ভিসাগুলোর ক্ষেত্রে অনুসরণ করা প্রতিটি পদ্ধতি নতুন এই তিন শ্রেণিতেও একইভাবে প্রয়োগ করা হবে, এমন কথা এখনই বলা যাচ্ছে না।

নতুন তালিকায় I visa যুক্ত হওয়ায় বিদেশি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকর্মীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পেশাগত কারণে তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতি, নির্বাচন, যুদ্ধ, সরকার, মানবাধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিপুলসংখ্যক পোস্ট থাকতে পারে। সংবাদ, প্রতিবেদন বা পেশাগত মন্তব্যও সেখানে থাকার কথা। কিন্তু এসব পোস্ট কীভাবে মূল্যায়ন করবেন ভিসা কর্মকর্তারা, নতুন নির্দেশনায় সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

ভিসার আবেদনপত্রে গত পাঁচ বছরে তালিকাভুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করা identifier দিতে হয়। কোনো অ্যাকাউন্ট এখন আর নিয়মিত ব্যবহার করা না হলেও ওই সময়ের মধ্যে সেটি ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তার তথ্য চাওয়া হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত সব identifier সঠিকভাবে জানাতে হবে। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে আবেদন প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে, এমনকি ভিসা নাকচও হতে পারে।

ভিসার আবেদন এখন আর শুধু কাগজপত্র আর সাক্ষাৎকারে সীমাবদ্ধ নেই। পাসপোর্টের পাতার পাশাপাশি আবেদনকারীর অনলাইন জীবনও এখন যাচাইয়ের অংশ। নতুন সিদ্ধান্তটি সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি উদাহরণ।

তথ্যসূত্র:
U.S. Department of State, September 18, 2026

Back to top button
🌐 Read in Your Language