কুমিল্লা

আইফোন ছিনতাই থেকে ‘অসম বন্ধুত্ব’ ও ৫ হাজার টাকার ক্ষোভ: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড়

কুমিল্লা, ২১ সেপ্টেম্বর – কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। মায়ের আইফোন ১৭ প্রো-ম্যাক্স ছিনিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক ধারণার বাইরে গিয়েও তদন্তকারীরা খুঁজে পেয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা ধারের ক্ষোভ, বয়সে ৫ থেকে ১০ বছর বড়দের সঙ্গে ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের ভয়াবহ রূপ।

এ ঘটনায় নিহত অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় ১৯ বছর বয়সী প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।

টিকটকের ফাঁদ ও পাহাড়ে নিয়ে নৃশংস হত্যা

তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করতে বার বার মোবাইলে মেসেজ পাঠায় প্রধান অভিযুক্ত তুহিন। দামি আইফোন দিয়ে টিকটক ভিডিও ও ছবি তোলার প্রলোভন দেখানো হলে বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের ফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম।

সিসিটিভি ফুটেজ: বেলা ৩টার দিকে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের একসাথে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখা যায়। পরবর্তীতে লালমাই পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে তাদের সাথে আরও দুই কিশোর যুক্ত হয়।

হত্যাকাণ্ডের বিবরণ: বিকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরের নির্জন জঙ্গলে অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাধা দিলে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে এবং অন্যরাও এলোপাতাড়ি মারধর করে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হলে ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। রাতভর মরদেহ জঙ্গলে পড়ে থাকায় শিয়াল টানাটানি করেছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

৫ হাজার টাকা ধারের ক্ষোভ ও ৫-১০ বছরের বড়দের ‘অসম বন্ধুত্ব’

আইফোন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরেকটি আর্থিক বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ:

৫ হাজার টাকার পাওনা: অপ্রতিমের বাবার ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো গ্রেপ্তার হওয়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর। অপ্রতিমের কাছ থেকে ধার নেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে ওই কিশোর মারাত্মক ক্ষুব্ধ ছিল। পুলিশকে সে জানায়, অপ্রতিমকে মেরে ফেললে আর টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন ভাবনা থেকে সে পরিকল্পনায় সামিল হয়।

প্রযুক্তিগত চতুরতা: ধরা পড়া এড়াতে ওই কিশোর ঘটনার দিন নিজের ফোন না নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যের ফোন ব্যবহার করে। পুলিশের আটকের সময়ও তার গায়ে নিহত অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের টি-শার্ট পরা ছিল।

বয়সের ব্যবধান: নিহত অপ্রতিমের বয়স মাত্র ১৩ বছর হলেও তার মেলামেশা ছিল ১৯ বছরের তুহিন ও অন্যান্য বয়সে বড় তরুণদের সাথে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে জানান, অপরাধে জড়িত চক্রটি কিশোর গ্যাংয়ের মতো এবং নিহত শিশুটির চেয়ে তাদের বয়স ৫ থেকে ১০ বছর বেশি।

দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর অপরাধ স্বীকার ও গ্রেপ্তার

শনিবার সকালে প্রথমে তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। শুরুতে বিষয়টি অস্বীকার করলেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৮টার দিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে সে। পরবর্তীতে তার ফোনে আসা কলের সূত্র ধরে অপ্রতিমের বাবার দোকানের কর্মচারী সেই কিশোরসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিয়াম নামে অপর এক তরুণের ভূমিকাও পুলিশ গুরুত্বের সাথে যাচাই করছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনাটির পেছনে কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক আছে কি না এবং ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা চূড়ান্তভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এনএন/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language