কানাডা কারও কাছে মাথা নত করে না: যুক্তরাষ্ট্রকে জ্য ক্রেঁতিয়ের কঠোর বার্তা
নজরুল মিন্টো

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে বিপর্যস্ত আমেরিকানদের জন্য ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিল কানাডার ছোট্ট শহর গ্যান্ডার। আর ঠিক সেই গ্যান্ডার থেকেই এবার যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন ভাষায় কানাডার অবস্থান জানিয়ে দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জ্য ক্রেঁতিয়ে। তাঁর বার্তা ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু দ্ব্যর্থহীন, বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে, কিন্তু কানাডা কারও কাছে মাথা নত করবে না।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডরের গ্যান্ডারে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ৯২ বছর বয়সী জ্য ক্রেঁতিয়ে। ৯/১১-এর সময় তিনিই ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। আবেগঘন সেই অনুষ্ঠানে অতীতের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করলেও তাঁর বক্তব্যের বড় একটি অংশ হয়ে ওঠে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সতর্কবার্তা।
ক্রেঁতিয়ে বলেন, “আমাদের উদারতাকে কখনো দুর্বলতা মনে করবেন না। আমাদের সহনশীলতাকে দৃঢ়তার অভাব ভাববেন না। আমাদের দয়াকে দুর্বলতা মনে করবেন না।” এরপর আরও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, “আমরা বন্ধুদের বুকে টেনে নিই, বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়াই। কিন্তু আমরা কারও কাছে মাথা নত করি না।”
ক্রেঁতিয়ে তাঁর বক্তৃতায় সরাসরি শুল্ক, বাণিজ্যযুদ্ধ কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তিকর কোনো মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে, তখন তাঁর প্রতিটি বাক্যই যেন ওয়াশিংটনের উদ্দেশে বলা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ৩৮টি বিমান গ্যান্ডারে অবতরণ করে। সাড়ে ছয় হাজারের বেশি যাত্রী ও ক্রু সেখানে আটকা পড়েন। ছোট্ট শহরটির মানুষ স্কুল, গির্জা ও বিভিন্ন স্থাপনা খুলে দেন। খাবার, ওষুধ ও থাকার ব্যবস্থা করেন। এমনকি অপরিচিত মানুষদের নিজেদের ঘরেও আশ্রয় দেন।
ক্রেঁতিয়ে সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, আমেরিকা আক্রান্ত হয়েছিল বলে কানাডা তখন পাশে দাঁড়াতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। ন্যাটোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ কার্যকর করার উদ্যোগেও কানাডা ছিল অগ্রণী। পরে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ১৬৫ জন কানাডিয়ান প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১৫৮ জন ছিলেন কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য।
অর্থাৎ ক্রেঁতিয়ের বার্তাটি ছিল পরিষ্কার, বিপদের দিনে যে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই কানাডাকে এখন হুমকি কিংবা অপমান করে নত করা যাবে না।
এটি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্রেঁতিয়ের প্রথম কঠিন বার্তা নয়। মাত্র কয়েক দিন আগেই CBC-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানাডা নীতির কঠোর সমালোচনা করেন ক্রেঁতিয়ে। আমেরিকান জনগণ ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে পার্থক্য টেনে ক্রেঁতিয়ে বলেছিলেন, আমেরিকানরা কানাডিয়ানদের পছন্দ করে, কানাডিয়ানরাও আমেরিকানদের ঘৃণা করে না। কিন্তু আমেরিকানরা এমন একজন প্রেসিডেন্ট বেছে নিয়েছে, যাঁর আচরণ তাঁর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’।
লেক অন্টারিওকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে ‘Lake America’ নাম দেওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়েও বিদ্রূপ করেছিলেন তিনি। ক্রেঁতিয়ের মতে, একটি দেশের প্রেসিডেন্ট যখন একটি হ্রদের নাম পরিবর্তনকে বড় রাজনৈতিক বিষয় বানান, তখন বোঝা যায় তাঁর হাতে আর জোরালো যুক্তি নেই। বিষয়টিকে তিনি ‘cheap and nasty’ আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। কানাডা অবশ্য ‘Lake Ontario’ নামই বহাল রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করেছিলেন ক্রেঁতিয়ে। তাঁর ভাষায়, কেউ দাদাগিরি করতে এলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হয়।
সেই বক্তব্যের কয়েক দিন পর গ্যান্ডারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যেন একই কথাকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরলেন। এবার শুধু ট্রাম্প নয়, তাঁর শ্রোতা ছিল পুরো যুক্তরাষ্ট্র।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, সত্য, পারস্পরিক সম্মান, বন্ধুত্ব ও ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই দুই দেশের সামনে পথ হওয়া উচিত। এরপর ফরাসি ভাষায় বলেন, “দীর্ঘজীবী হোক যুক্তরাষ্ট্র, দীর্ঘজীবী হোক কানাডা।”
গ্যান্ডারের মিলনায়তনে উপস্থিত মানুষ দাঁড়িয়ে তাঁকে দীর্ঘ করতালি দেন। কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রাও মঞ্চে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করেন।
সেই দৃশ্যটিও ক্রেঁতিয়ের পুরো বক্তব্যের অর্থ বুঝিয়ে দেয়। তিনি আমেরিকাকে শত্রু বলেননি। আমেরিকান জনগণকেও আক্রমণ করেননি। বরং একটি পুরোনো বন্ধুত্বের ইতিহাস সামনে রেখেই ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, বন্ধুত্ব মানে আনুগত্য নয়, উদারতা মানে দুর্বলতা নয়।
তথ্যসূত্র:
Associated Press, 11 September 2026
Toronto Star, 11 September 2026







