সম্পাদকের পাতা

কক্সবাজারের সমুদ্রকন্যা ফাতেমা এবার বিশ্বমঞ্চে

নজরুল মিন্টো

বেশ কয়েক বছর আগে একটি মুভি দেখেছিলাম। নাম ‘ন ডরাই’। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বাংলায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এমনিতেই খুব বেশি হয়নি। তার ওপর বিষয় সারফিং, যে খেলাটি তখন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই প্রায় অচেনা। ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা হকি নয়, বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর একটি সরু বোর্ড নিয়ে ছুটে চলার গল্প। ফলে ছবিটি শুরু হওয়ার পর থেকেই কক্সবাজারকে যেন একটু অন্যভাবে দেখতে হয়েছিল।

সকালের কক্সবাজার। দূরে একের পর এক ঢেউ এসে ভাঙছে সৈকতে। লবণাক্ত বাতাস, সমুদ্রের গর্জন আর বালুর ওপর দিয়ে সার্ফবোর্ড হাতে ছুটে যাচ্ছে একটি মেয়ে। তার নাম আয়েশা। দরিদ্র পরিবারের সাধারণ এক কিশোরী। কিন্তু সমুদ্রে নামলেই সে আর সাধারণ থাকে না। বোর্ডে বুক রেখে ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে যায়, ঠিক সময়টিতে উঠে দাঁড়ায়, তারপর উত্তাল পানির পিঠে ভারসাম্য রেখে ছুটে চলে। কখনো পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। সমুদ্র তার কাছে শুধু খেলার জায়গা নয়, মুক্তির জায়গাও। অথচ ডাঙায় ফিরে এলেই অপেক্ষা করে পরিবার, সমাজ, নিষেধ, কটূক্তি এবং মেয়েদের জন্য আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জীবনের নিয়ম। সারফিং করতে চাওয়া সেই মেয়েটিকে বিয়ে, সামাজিক চাপ এবং নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। তবু তার ভেতরে সমুদ্র থেকে যায়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘ন ডরাই’ অর্থ ভয় পাই না। ছবিটির মূল কথাটিও যেন ছিল সেটাই।

বাংলাদেশের মতো দেশে সারফিং নিয়ে সিনেমা বানানোই যখন বিস্ময়ের, তখন কোনো একদিন বাংলাদেশের একটি মেয়ে আন্তর্জাতিক কোনো বড় আসরে সার্ফবোর্ড হাতে নামবে, সেটি তো আরও বড় বিস্ময়ের।

পর্দার আয়েশা নয়, এবারের মেয়েটির নাম ফাতেমা আক্তার। বয়স মাত্র ১৬। দশম শ্রেণির ছাত্রী। বাড়ি কক্সবাজারে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত ২০তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সারফার হিসেবে ঢেউয়ে নামতে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে পুরুষ বিভাগে থাকবেন ২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ মান্নান। ২০২৫ সালে ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সারফিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ দল নবম হয়ে এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। বাংলাদেশের জন্য ঘটনাটি যেমন ঐতিহাসিক, সারফিংয়ের জন্যও এবারের এশিয়ান গেমস বিশেষ। কারণ ২০২৬ সালেই প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের প্রতিযোগিতায় সারফিং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ফাতেমার গল্পটাও অনেকটা সিনেমার মতো। মাত্র ১১ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে সৈকতে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে সারফিংয়ের সঙ্গে পরিচয়। প্রথম দেখাতেই খেলাটির প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু বাড়িতে বলার সাহস ছিল না। শুরু করেন লুকিয়ে লুকিয়ে অনুশীলন। বাবাকে ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন। মা বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালান। এমন একটি পরিবারের মেয়ে প্রতিদিন সার্ফবোর্ড নিয়ে সমুদ্রে নামবে, সেটি আশপাশের অনেকেই সহজভাবে নেননি। প্রশ্ন উঠেছে, একটি মেয়ে সৈকতে কী করছে, কেন সে সারফিং করছে। এমনকি সারফিং করলে গায়ের রং কালো হয়ে যাবে, বিয়ে হতে সমস্যা হবে, এমন কথাও তাঁকে শুনতে হয়েছে।

প্রতিবেশীদের কথা শুনতে হয়েছে তাঁর মাকেও। একপর্যায়ে Bangladesh Surf Girls and Boys Club-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রশিক্ষক রাশেদ আলম এগিয়ে এসে ফাতেমার মাকে বোঝান, মেয়েটির মধ্যে সম্ভাবনা আছে। শুধু সারফিং নয়, ফাতেমার পড়াশোনাও যাতে বন্ধ না হয়, সেদিকেও নজর রাখেন তিনি। এখন সপ্তাহের কর্মদিবসে তাঁর অগ্রাধিকার স্কুল ও পড়াশোনা, আর ছুটির দিনের বড় অংশ চলে যায় সমুদ্রে অনুশীলনে।

সমুদ্রের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বোঝাতে ফাতেমা খুব বড় কোনো কথা বলেননি। AFP-কে তিনি বলেছেন, বোর্ডে উঠলে সবকিছু ভুলে যান। একটি ঢেউ সফলভাবে পাড়ি দিতে পারলে যে আনন্দ অনুভব করেন, সেটি ভাষায় বোঝানো কঠিন। কিন্তু তাঁর পথের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি অন্য জায়গায়। তিনি যখন সারফিং শুরু করেছিলেন, সঙ্গে আরও কয়েকজন মেয়ে ছিল। সেই দল থেকে এখন টিকে আছেন মাত্র দুজন। অন্যদের অনেকের জীবন থেকে সার্ফবোর্ড সরিয়ে দিয়েছে বিয়ে ও পারিবারিক বাস্তবতা। যে বান্ধবীরা তাঁকে সারফিং শিখিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও সৈকতের দিনগুলো মনে করেন এবং ফাতেমাকে বলেন, সারফিং যেন তিনি ছেড়ে না দেন।

এই জায়গাতেই ফাতেমার সাফল্য একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। কারণ কক্সবাজারের মেয়েদের সারফিংয়ের ইতিহাস নতুন নয়। নাসিমা আক্তার বাংলাদেশের নারী সারফিংয়ের পথিকৃৎ। শৈশবে কঠিন জীবন পার করা নাসিমা কিশোর বয়সেই সারফিং শিখেছিলেন এবং সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘Nasima: The Most Fearless’ তথ্যচিত্র। একটি মেয়ের ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার লড়াই কীভাবে আরও অনেক মেয়ের জন্য দরজা খুলে দিতে পারে, নাসিমার জীবন তারই উদাহরণ।

কক্সবাজারের আরও তিন কিশোরী শোবে, আয়েশা ও সুমার জীবন উঠে এসেছে ‘Bangla Surf Girls’ নামে আরেকটি তথ্যচিত্রে। দারিদ্র্য, পরিবারের চাপ এবং সামাজিক বাধার মধ্যেও কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা সমুদ্রে নামত। ঢেউয়ের ওপর দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেত তাদের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সৈকতের বাইরে অপেক্ষা করত সংসারের আয় করার চাপ, বিয়ে এবং তাদের জীবন নিয়ে অন্যদের সিদ্ধান্ত। কক্সবাজারের এসব মেয়ের কাছে সারফিং তাই শুধু খেলা ছিল না, ছিল কয়েক ঘণ্টার স্বাধীনতাও।

বাংলাদেশে স্থানীয়দের মধ্যে সারফিং ছড়িয়ে পড়ার পেছনেও রয়েছে কক্সবাজারে আসা বিদেশি সারফারদের ভূমিকা। তাঁদের দেখে স্থানীয় তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়, কেউ কেউ বিদেশিদের রেখে যাওয়া বোর্ড দিয়েই খেলাটি শিখতে শুরু করেন। রাশেদ আলমও এভাবেই সারফিংয়ের প্রেমে পড়েন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় সারফ প্রশিক্ষক ও লাইফগার্ড হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে কক্সবাজারে ক্লাব গড়ে তোলেন এবং ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। আজ ফাতেমা যে সার্ফবোর্ডে দাঁড়িয়ে জাপানের কথা ভাবছেন, তার পেছনে তাই বহু বছরের ছোট ছোট অনেক গল্প রয়েছে।

বিশ্বে অবশ্য সারফিং মোটেও ছোট কোনো খেলা নয়। এর শিকড় প্রাচীন পলিনেশীয় সংস্কৃতিতে, পরে হাওয়াইকে কেন্দ্র করে আধুনিক সারফিংয়ের বিকাশ ঘটে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে Tokyo 2020 অলিম্পিকে, যা ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হয়, প্রথমবারের মতো অলিম্পিকের মঞ্চে জায়গা পায় সারফিং। আর এবার প্রথমবার এশিয়ান গেমসেও শুরু হচ্ছে এই খেলার প্রতিযোগিতা।

বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়া এই খেলায় বাংলাদেশের পথ অবশ্য এখনও সহজ নয়। কক্সবাজারের তুলনামূলক ছোট ঢেউ, উন্নত সার্ফবোর্ড ও সরঞ্জামের অভাব এবং বড় ঢেউয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকা বড় বাধা। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ফাতেমা ও মান্নান প্রতিদিন অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জাপানের সমুদ্র।

২০তম এশিয়ান গেমস অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর। সারফিং প্রতিযোগিতা হবে জাপানের আইচি প্রিফেকচারের তাহারা শহরের Pacific Long Beach-এ। প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে মুখ করা এই সৈকত জাপানের পরিচিত সারফিং স্পটগুলোর একটি। সেখানে এশিয়ার অভিজ্ঞ সারফারদের সামনে দাঁড়াতে হবে ফাতেমা আক্তারকে।

তিনি পদক জিতবেন কি না, সেটি এখনই বলা যায় না। কিন্তু সব সাফল্যের হিসাব পদক দিয়ে হয় না। যে দেশে দুই দশক আগেও সার্ফবোর্ড ছিল অধিকাংশ মানুষের কাছে বিস্ময়ের বস্তু, যে কক্সবাজারে মেয়েদের সমুদ্রে নামা নিয়েই প্রশ্ন উঠত, সেখানকার একটি কিশোরী আজ বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে এশিয়ান গেমসের ঢেউয়ের সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছে। এটিও বিশাল অর্জন।

ফাতেমার গল্পটি তাই শুধু সারফিংয়ের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের আরও হাজারো মেয়ের জন্য একটি বার্তা। কেউ যদি বলে খেলাটি মেয়েদের জন্য নয়, কেউ যদি বলে গায়ের রং নষ্ট হবে, বিয়ে হবে না, পরিবার কী বলবে, সমাজ কী বলবে, তখন কক্সবাজারের সেই মেয়েটির কথা মনে করা যেতে পারে, যে ১১ বছর বয়সে লুকিয়ে সারফিং শুরু করেছিল এবং পাঁচ বছর পর পৌঁছে গেছে এশিয়ান গেমসে।

বেশ কয়েক বছর আগে ‘ন ডরাই’ ছবিতে যে আয়েশাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, সে ছিল সিনেমার চরিত্র। আজ একই কক্সবাজারের সমুদ্রে আরেক কিশোরী সত্যিই বোর্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সামনে জাপানের সমুদ্র এবং আরও বড় ঢেউ। পর্দার আয়েশার মতো বাস্তবের ফাতেমাও যেন বাংলাদেশের মেয়েদের উদ্দেশে একটি কথাই বলছে, ‘ন ডরাই’।

এনএন/ ৩০ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language