সম্পাদকের পাতা

কানাডিয়ান পণ্য কিনুন আমেরিকান পণ্য বয়কট করুন

নজরুল মিন্টো

সুপারমার্কেটের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে একই ধরনের দুই পণ্যের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার মুহূর্তটি এত দিন ছিল নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। এখন আর তা নয়। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ এখন কানাডিয়ানদের কেনাকাটার ভাবনাতেও প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ২২ আগস্ট কানাডার ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার পর কানাডাও পাল্টা জবাব দিয়েছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর রাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হবে।

এই খবর শুনে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, তাহলে কি বাজারে সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়বে? সংসারের বাজেট কি আবার নতুন করে ওলটপালট হয়ে যাবে? না, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কানাডার সামনে বিকল্পের অভাব নেই। নিজেদের উৎপাদন তো আছেই, পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশ থেকে পণ্য আনার ব্যবস্থাও আছে।

তাই ৮ সেপ্টেম্বর আসছে বলে ঘরে ঘরে পণ্য মজুত করার কোনো প্রয়োজন নেই। বছরের প্রয়োজনের শ্যাম্পু কিনে বাথরুম ভরে রাখারও দরকার নেই। নতুন ফ্রিজের প্রয়োজন নেই অথচ শুধু শুল্কের ভয়ে আজই একটি কিনে ফেলতে হবে, এমনও নয়। বরং এখন সময় একটু বেশি করে পণ্যের লেবেল পড়ার, কোথায় তৈরি হয়েছে তা দেখার এবং একই পণ্যের বিকল্প খোঁজার। আর এখানেই কানাডার সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগটি তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর একমাত্র শ্যাম্পু প্রস্তুতকারক দেশ নয়। ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, আসবাব কিংবা ইলেকট্রনিকসেরও একমাত্র উৎস নয়। পৃথিবীর বিশাল উৎপাদনব্যবস্থা ছড়িয়ে আছে এশিয়া, ইউরোপ এবং বিশ্বের আরও বহু দেশে। দক্ষিণ কোরিয়ার ফ্রিজ আছে, জাপানের ইলেকট্রনিকস আছে, ভিয়েতনামের পোশাক আছে, মালয়েশিয়ার শিল্পপণ্য আছে, ইউরোপের প্রসাধনী ও গৃহস্থালি পণ্য আছে। তারপর আছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্র চীন। ফলে কোনো একটি আমেরিকান পণ্যের দাম বেড়ে গেলেই কানাডার বাজারে তার বিকল্প উধাও হয়ে যাবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

কানাডার বাণিজ্য কাঠামোটিও এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নয়। কানাডার সঙ্গে জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশের বিস্তৃত বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও কানাডার আলাদা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রয়েছে CETA। অর্থাৎ আমেরিকান পণ্যের জায়গায় অন্য দেশ থেকে পণ্য আনার জন্য কানাডাকে নতুন করে পৃথিবীর দরজা খুঁজতে বের হতে হবে না। দরজাগুলো অনেক আগেই খোলা হয়েছে।

এর প্রমাণও ইতিমধ্যে কানাডার বাণিজ্যের সংখ্যাতেই রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে কানাডা ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। শুধু চীন থেকেই ওই সময়ে এসেছে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। জাপান থেকে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও একই সময়ে কানাডার আমদানি ছিল ২১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

আরও একটি সংখ্যা ভবিষ্যতের দিকটি দেখিয়ে দেয়। ২০২৫ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে কানাডার আমদানিতে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ভিয়েতনাম থেকে। এক বছরেই ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বেড়েছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বা ৩১ শতাংশ। কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিকস ছিল সেই বৃদ্ধির বড় অংশ। অর্থাৎ সরবরাহের পথ ইতিমধ্যে তৈরি আছে, ব্যবসায়িক সম্পর্কও আছে। এখন বাজারের চাহিদা বদলালে সেই পথ আরও প্রশস্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

কোনো একটি মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্য বেশি দামে বিক্রি করে পাশে অপেক্ষাকৃত সস্তা কোরিয়ান, জাপানি, ইউরোপীয় কিংবা কানাডিয়ান পণ্য রেখে ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি কোনো ব্যবসায়ীই নেবে না। বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাই তাদের বিকল্প উৎসের দিকে নিয়ে যাবে। আর এই জায়গায় সাধারণ কানাডিয়ানদের হাতে রয়েছে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রটি, তাদের দেশপ্রেম।

একজন ভোক্তা তার এক ডলার কোথায় ব্যয় করছেন, শেষ পর্যন্ত সেই ডলারই কোনো না কোনো কোম্পানির আয়, কোনো শ্রমিকের মজুরি, কোনো কারখানার উৎপাদন এবং কোনো দেশের অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত হয়। তাই একই মান ও কাছাকাছি দামে একটি কানাডিয়ান এবং একটি আমেরিকান পণ্য সামনে থাকলে কানাডিয়ান পণ্যটি বেছে নেওয়া এখন আর শুধু কেনাকাটা নয়। এটি দেশের অর্থনীতির পক্ষে একটি ভোট।

এক বোতল কানাডিয়ান দুধ কিনলে সেই অর্থের একটি অংশ ফিরে যায় কানাডার কৃষকের কাছে। কানাডায় তৈরি আসবাব কিনলে কাজ থাকে কানাডার কোনো কারখানায়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাবার কিনলে লাভবান হয় কৃষক, পরিবহনকারী, প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান, দোকান এবং সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ। সেই কর্মীরা আবার তাদের আয় এই দেশেই ব্যয় করেন। একটি ডলার অর্থনীতির ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে আরও বহু মানুষের আয় তৈরি করে।

বিপরীত দিকে একটি আমেরিকান পণ্য কিনলে সেই অর্থের একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায় সেই দেশের কোম্পানির কাছে, যে দেশের সরকার একই সময়ে কানাডার পণ্যের সামনে ৫০ শতাংশ শুল্কের দেয়াল তুলেছে। তাহলে প্রশ্নটি খুবই সহজ। যে দেশ কানাডার পণ্যের সামনে দেয়াল তুলছে, সেই দেশের পণ্য কেন কানাডিয়ানরা কিনবেন? না, কিনবেন না। কানাডিয়ান শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নাগরিকের দায়িত্ব। নিজেদের বাজারে কানাডিয়ান উৎপাদকদের মার্কিন পণ্যের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী করা আমাদের কর্তব্য।

দোকানে গিয়ে আগে খুঁজতে হবে কানাডিয়ান পণ্য। সেটি না পাওয়া গেলে দেখা যেতে পারে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের পণ্য আছে কি না। যেখানেই বিকল্প আছে, সেখানেই আমেরিকান পণ্যকে ‘না’ বলতে হবে।

একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা দরকার। শুধু ম্যাপল লিফের ছবি দেখলেই সব পণ্য শতভাগ কানাডায় উৎপাদিত, এমন নয়। প্যাকেটের গায়ে ‘Product of Canada’, ‘Made in Canada’, ‘Prepared in Canada’ কিংবা শুধু কানাডিয়ান পতাকা, প্রতিটির অর্থ এক নয়। ফলে সচেতন ক্রেতাকে লেবেল একটু মন দিয়ে পড়তে হবে। যেখানেই সম্ভব, প্রকৃত কানাডিয়ান উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে সরাসরি সমর্থন।

বহু দশক ধরে কানাডার ব্যবসা ও ভোক্তা, দুই পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। বর্তমান সংকট সেই অভ্যাস বদলে দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। আজকের বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র এশিয়া। স্মার্টফোন থেকে টেলিভিশন, পোশাক থেকে জুতা, রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এশিয়ার বিপুল উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। কানাডা এখন বিশ্বের এসব বড় উৎপাদনকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে।

দেশপ্রেম সব সময় পতাকা হাতে রাস্তায় নামার নাম নয়। কখনো কখনো দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটে সুপারমার্কেটের একটি ট্রলিতেও। তাই আগে খুঁজুন কানাডিয়ান পণ্য। সেটি না থাকলে কানাডার অন্য বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্য বেছে নিন। Buy Canadian. Stand with Canada.

এনএন/ ২৯ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language