
টরন্টোর কোনো বাড়ির সামনে একসময় ‘ফর সেল’ সাইন উঠলেই শুরু হয়ে যেত প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত দামের চেয়ে কে কত বেশি দিতে পারবেন, কত দ্রুত শর্তহীন প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন, সেটিই যেন ছিল বাজারের নিয়ম। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। ক্রেতারা আর আগের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন না; সময় নিয়ে বাড়ি দেখছেন, দরদাম করছেন, আবার অনেকে আরও কম দামের অপেক্ষায় রয়েছেন। জুলাইয়ের পরিসংখ্যানও সেই পরিবর্তনের কথাই বলছে। কয়েক বছর আগে যে বাজারে বিক্রেতার কথাই ছিল প্রায় শেষ কথা, সেখানে এখন ক্রেতার হাতে অপেক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
টরন্টো রিজিওনাল রিয়েল এস্টেট বোর্ড বা TRREB-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে বৃহত্তর টরন্টো এলাকায় বিক্রি হওয়া বাড়ির গড় মূল্য ছিল প্রায় ১০ লাখ ৪ হাজার ডলার। গত বছরের জুলাইয়ে এই গড় ছিল প্রায় ১০ লাখ ৫২ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে গড় দাম কমেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। জুলাইয়ে মোট ৫ হাজার ৯৯৫টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কম।
আরও বড় চিত্রটি দেখা যায় ২০২২ সালের সঙ্গে তুলনা করলে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বৃহত্তর টরন্টো এলাকার আবাসনবাজার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেই সময়ের তুলনায় গড় বিক্রয়মূল্য এখন প্রায় ২৪ শতাংশ কম। অর্থাৎ গত কয়েক বছরের মূল্যপতন সামান্য কোনো ওঠানামা নয়। অতিরিক্ত চাহিদা এবং কম সুদের সময়ে যে বাড়িগুলো অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল, সেগুলোর বাজারমূল্য এখন অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে এসেছে।
তবে দাম কমার পরও কেন ক্রেতারা দলে দলে বাজারে ফিরছেন না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। TRREB সভাপতি ড্যানিয়েল স্টেইনফেল্ডের মতে, অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা আবাসনবাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে আরও নিশ্চয়তার অপেক্ষায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের খরচ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত বড় অঙ্কের মর্টগেজ নিতে অনেকে দ্বিধায় থাকছেন। বাড়ির দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু মাসিক কিস্তি, সম্পত্তিকর, কনডো ফি, বীমা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা।
জুলাইয়ে বিক্রি ও নতুন তালিকার অনুপাত ছিল ৪১ শতাংশ। এই হার বলছে, বাজারে বিক্রেতাদের আগের মতো একতরফা সুবিধা নেই। বেশি দাম ধরে বসে থাকলে ক্রেতা পাওয়া কঠিন হতে পারে, আর যাঁদের বাড়ি বিক্রি করতেই হবে, তাঁদের শেষ পর্যন্ত দাম কমাতে হতে পারে।
বাজারে নতুন বাড়ির তালিকাও কমেছে। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় নতুন তালিকা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। জেসন মার্সারের মতে, প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেক বিক্রেতা বাড়ি বাজার থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। TRREB মনে করছে, এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ কমে গিয়ে দামের পতন কিছুটা থামতে পারে।
সব ধরনের বাড়ির দামই গত বছরের তুলনায় কমেছে। সেমি-ডিট্যাচড বাড়ির গড় মূল্য সবচেয়ে বেশি, ৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। টরন্টো শহরের ভেতরে এই শ্রেণির বাড়ির দাম প্রায় ১০ শতাংশ নেমেছে। ডিট্যাচড বাড়ির দাম কমেছে ৫ শতাংশ, টাউনহোমের ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং কনডোর ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যপতন শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের বাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই।
সেমি-ডিট্যাচড বাড়ির দামে তুলনামূলক বড় পতনের একটি কারণ হিসেবে TRREB-এর প্রধান তথ্য কর্মকর্তা জেসন মার্সার বলেছেন, গত বছরের তুলনায় এবার উচ্চমূল্যের সেমি-ডিট্যাচড বাড়ি কম বিক্রি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক গড়ও বেশি নেমেছে। তাই কোনো একটি এলাকার নির্দিষ্ট বাড়ির মূল্য শুধু সামগ্রিক গড় দিয়ে বিচার করা যাবে না। বাড়ির অবস্থান, জমির আকার, সংস্কার, স্কুল এলাকা, পরিবহন সুবিধা এবং আশপাশের সাম্প্রতিক বিক্রির তথ্যও দেখতে হয়।
ব্যাংক অব কানাডা ১৫ জুলাই নীতিনির্ধারণী সুদের হার ২ দশমিক ২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থনীতিতে উন্নতির কিছু লক্ষণ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে বাড়ির দাম কমলেও মর্টগেজের খরচ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বর্তমান বাজারে ক্রেতাদের হাতে কয়েক বছর আগের তুলনায় বেশি দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি পরীক্ষা করে নেওয়া ও অর্থায়নের শর্ত রাখা কিংবা চাওয়া দামের নিচে প্রস্তাব দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে।
টরন্টোর আবাসনবাজারের বর্তমান চিত্র দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির। দাম ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং দরদামের সুযোগও বেড়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটতে দেরি হলে দাম আরও কমতে পারে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে টরন্টোর বাড়ির দাম কিছুটা নাগালের মধ্যে আসার অপেক্ষায় ছিলেন, জুলাইয়ের পরিসংখ্যান তাঁদের জন্য অন্তত আশার খবর।
তথ্যসূত্র:
Toronto Regional Real Estate Board, 6 August 2026
Toronto Star, 6 August 2026









