৭ মাসের ফুটফুটে স্যামকে কেড়ে নিল ইসরায়েলি বুলেট! নির্দেশ মেনে গাড়ি থামানোর পরও কেন এই নৃশংসতা?

জেরুজালেম, ৬ জুন – দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফের এক বর্বরোচিত ও বুকভাঙা ঘটনা ঘটল। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম বুলেটের আঘাতে এবার প্রাণ হারাল মাত্র সাত মাস বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশু। গত শুক্রবার পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরের তেল রূমেইদা এলাকায় একটি ফিলিস্তিনি পারিবারিক গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালালে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত ওই নিষ্পাপ শিশুটির নাম স্যাম ফাহদ আবু হাইকাল। গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই হামলায় শিশুটির বাবা-মাও গুরুতর আহত হয়েছেন।
নিহত শিশু স্যামের বাবা ফাহদ আবু হাইকাল পেশায় বেথলেহেম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক। ইসরায়েলি প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’-এর সঙ্গে আলাপকালে সেই রোমহর্ষক ও নৃশংস মুহূর্তের বর্ণনা দেন তিনি।
ফাহদ জানান, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ইসরায়েলি সেনারা তাকে গাড়ি থামানোর ইঙ্গিত দিলে তিনি সম্পূর্ণভাবে গাড়ি থামিয়ে নিজের দুই হাত স্টিয়ারিং হুইলের ওপর তুলে ধরেন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই ঠিক তার পরপরই গাড়িটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়তে শুরু করে সেনারা। একটি বুলেট ফাহদের হাত ভেদ করে পেছনের আসনে মায়ের কোলে বসে থাকা সাত মাসের শিশু স্যামের গায়ে গিয়ে বিদ্ধ হয়।
সেনারা ভুলবশত বা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে—ইসরায়েলি বাহিনীর এমন দাবি কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন ফাহদ আবু হাইকাল। তিনি বলেন, “ইসরায়েলি সেনা সদস্য আমার থেকে মাত্র ১০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আমাকে, আমার স্ত্রী ও সন্তানদের খুব স্পষ্ট দেখেছেন। আমাদের গাড়ির কাচ কালো (টিন্টেড) ছিল না। ভরদুপুরে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। গাড়িতে যে একটা পরিবার ছিল, তা তিনি দেখেননি—এমন বলার কোনো সুযোগই নেই।”
গাড়িতে তাদের ১১ বছর বয়সী আরও একটি ছেলে এবং তার নানিও ছিলেন, যারা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন।
আইডিএফ-এর সেই চেনা অজুহাত ও তদন্তের ‘নাটক’
বরাবরের মতোই এই হত্যাকাণ্ডের পরও আত্মপক্ষ সমর্থনে চেনা অজুহাত দাঁড় করিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এক বিবৃতিতে তারা দাবি করেছে, একটি গাড়ি নাকি তাদের দিকে ‘দ্রুত গতিতে’ এগিয়ে আসছিল, তাই সন্দেহ থেকে সৈন্যরা গুলি চালায়।
তবে পরবর্তীতে তাদেরই প্রাথমিক সামরিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, গাড়িতে থাকা ব্যক্তিরা সবাই নিরীহ বেসামরিক নাগরিক ছিলেন এবং কোনো ধরনের সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ঘটনার পর আইডিএফ স্রেফ ‘গভীর দুঃখ প্রকাশ’ করেই দায় সারতে চাইছে।
‘আমি হাল ছাড়ব না’—বিচারের দাবিতে অনড় বাবা
সন্তানহারা শিক্ষক ফাহদ আবু হাইকাল এই আন্তর্জাতিক অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং খুনি সেনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “যদি পৃথিবীতে কোনো বিবেক, আইন বা নৈতিকতা বেঁচে থাকে, তাহলে আমি আশা করব এই কাপুরুষোচিত গুলি চালানো সেনাকে জবাবদিহি করতে হবে। তদন্ত ছাড়া এই মামলা যেন বন্ধ না করা হয়। অন্তত আমি আমার সন্তানের খুনের বিচার না পেয়ে হাল ছাড়ার পাত্র নই।”
পশ্চিম তীরে শিশুদের জন্য এক জীবন্ত জাহান্নাম
ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন পরিকল্পিত হামলা এটিই প্রথম নয়। গত মার্চ মাসেই উত্তর জর্ডান উপত্যকার তামোউন গ্রামে একটি গাড়িতে গুলি চালিয়ে এক ফিলিস্তিনি দম্পতি এবং তাদের দুই শিশুকে জ্যান্ত হত্যা করেছিল ইসরায়েলি সেনারা।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিতসেলেম’ (B’Tselem)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া বাকি দুই শিশুকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে ঘটনাস্থলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করা হয়েছিল এবং ছটফট করতে থাকা রক্তাক্ত পরিবারটির কাছে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।
জাতিসংঘের সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কেবল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমেই ২৪০ জন শিশুসহ ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আর চলতি ২০২৬ সালেই এই অঞ্চলে নিভে গেছে আরও ৪৯টি তাজা প্রাণ।
আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতার সুযোগে দিনের পর দিন ভারী হচ্ছে ফিলিস্তিনি মা-বাবার কোল খালি হওয়ার মিছিল।
এনএন/ ৬ জুন ২০২৬









