দেশে মে মাসে মব জাস্টিসে ৩২ জনের মৃত্যু, মানবাধিকার প্রতিবেদনে উদ্বেগ

ঢাকা, ৩১ মে – দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর ও আশঙ্কাজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মে মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণে (গণপিটুনি) ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যা আগের মাসের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে মে মাসে দেশজুড়ে নদী, সড়ক, রেললাইন ও ফসলি জমি থেকে ৫৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে মে ও এপ্রিল মাসের দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রোববার (৩১ মে) এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
এমএসএফ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক বিরোধের জেরে মব সন্ত্রাসের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
মে মাসে সারা দেশে ৬৯টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩২ জন নিহত এবং ৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এপ্রিলে এই ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন এবং আহত হন ৪৯ জন।
সংগঠনটি জানিয়েছে, মূলত চুরি, ধর্ষণচেষ্টা এবং জমির বিরোধের মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এসব মব সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা নির্দেশ করে। এছাড়া মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামক একটি সিনেমা প্রদর্শনে জোরপূর্বক বাধা দেওয়ার ঘটনাকেও একটি ‘মব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এমএসএফ।
মানবাধিকার সংগঠনটির তথ্যমতে, মে মাসে দেশজুড়ে মোট ৫৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এপ্রিল মাসে এই সংখ্যাটি ছিল ৫৬টি।
এমএসএফ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, বিপুল পরিমাণ অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হওয়া মূলত সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম বা অপরাধের অপ্রকাশিত মাত্রা নির্দেশ করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মরদেহগুলো পাওয়ার ঘটনা এবং এর কোনো সুরাহা না হওয়া কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও সীমান্ত পরিস্থিতি
রাজনৈতিক সংঘর্ষ: মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা এপ্রিলের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এপ্রিলে যেখানে ৩০৩ জন আহত হয়েছিলেন, সেখানে মে মাসে আহত হয়েছেন ১৯৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ৩ জন। তবে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের মধ্যকার সংঘর্ষ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল পরিস্থিতিকে এখনো জটিল করে রাখছে।
সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি: মে মাসে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে মানবাধিকার সুরক্ষার বড় ঘাটতি দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে সীমান্তে ৮ জন নিহত হলেও মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১০ জন। এছাড়া মে মাসে ভারতীয় সীমান্তে নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত হয়েছেন ১৩ জন এবং ১০ জনকে পুশ ইন (বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানো) করা হয়েছে।
কারা হেফাজত ও সাংবাদিক নির্যাতন
কারাগারে মৃত্যু: মে মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩ জন কয়েদি এবং ৪ জন হাজতি ছিলেন। এপ্রিলে এই সংখ্যাটি ছিল ৬ জন।
সাংবাদিকদের ওপর আইনি চাপ: মে মাসে ৩৪ জন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন (এপ্রিলে ছিল ৪৬ জন)। তবে এমএসএফ বলছে, সাংবাদিকদের ওপর এখন শারীরিক হামলার চেয়ে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বা হয়রানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের প্রতিবেদনের শেষভাগে জানিয়েছে, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি সংখ্যাগত কিছু জায়গায় উন্নত মনে হলেও কাঠামোগতভাবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে আইনের শাসনের দুর্বলতা, জবাবদিহিতার তীব্র অভাব এবং সামাজিক বিরোধগুলো দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেওয়ার এই প্রবণতা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে সামনে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এনএন/ ৩১ মে ২০২৬









