জুনের শেষে প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরে নিতে চায় বেইজিং, গুরুত্ব পেতে পারে যেসব বিষয়

ঢাকা, ১৮ মে – বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত মোড় নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা–বেইজিংয়ের মধ্যকার রাজনৈতিক স্তরের যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। এরই ধারাবাহিকতায়, আগামী জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিং সফরে নিয়ে যাওয়ার জন্য গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে পরাশক্তি চীন। বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব অনুযায়ী, এই হাই-প্রোফাইল সফরটি দুই দিনেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
কূটনৈতিক একাধিক শীর্ষ সূত্রের বরাত দিয়ে দেশের একটি জাতীয় দৈনিক নিশ্চিত করেছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং পৌঁছানোর প্রথম দিনেই চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে পৃথক মেগা বৈঠকে বসতে পারেন। তবে দ্বিপাক্ষিক এই মেগা সফরে কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠকই নয়, টেবিলে উঠতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো খাতের বেশ কিছু গেম-চেঞ্জার ইস্যু।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি কিছু বড় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হতে পারে।
আলোচনার মূল টেবিলে যে ৫টি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে:
১. তিস্তা মহাপরিকল্পনা (Teesta Mega Plan):
উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভাগ্য জড়ানো এবং দেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে এই সফরে চূড়ান্ত রূপরেখা আসতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা করা প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।
২. চীনা শিল্প স্থানান্তর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল:
দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে সরাসরি চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর (Industrial Relocation) এবং চীনের জন্য নির্ধারিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত চালুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে টেবিলে তোলা হবে।
৩. মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন:
পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর ‘মোংলা বন্দর’-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও এর আধুনিকায়নে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি এই সফরে চূড়ান্ত হতে পারে।
৪. সরাসরি নতুন বিমান রুট চালু:
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রসার ঘটাতে দুই দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহরগুলোর মধ্যে সরাসরি আকাশপথ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হবে। এর মধ্যে গুয়াংজু-চট্টগ্রাম এবং সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি ফ্লাইট চালু অন্যতম।
৫. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ভূমিকা:
মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বেইজিং যাতে আরও বেশি ‘অ্যাকটিভ’ বা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সেই বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বেইজিং ও ঢাকার কূটনীতিতে এক নতুন হাওয়া বইছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেটিকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চায়।
ইতিমধ্যেই গত মাসে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এবং চলতি মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বেইজিং সফর করে এই শীর্ষ বৈঠকের আবহ তৈরি করে এসেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রস্তাবিত বেইজিং সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নয়, আগামী দিনে বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান কোন পথে এগোবে, তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস্টারস্ট্রোক হতে যাচ্ছে।
এনএন/ ১৮ মে ২০২৬









