জাতীয়

ইউজিসির ‘হিট’ প্রকল্পে চার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও হরিলুটের অভিযোগ

ঢাকা, ১১ এপ্রিল – দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭০টির বেশি হলেও অধিকাংশ স্থানেই গবেষণার হার অত্যন্ত সীমিত। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ বা হিট নামের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে চার হাজার কোটি টাকার এই গবেষণা প্রকল্প ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং হিট প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তা বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও ভাগবাটোয়ারায় জড়িয়ে পড়েছেন।

এ প্রকল্পের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। এর ফলে বিপুল অঙ্কের এই ঋণনির্ভর প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জানা যায়, পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যার অর্ধেক বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি অংশ বিশ্বব্যাংক বহন করবে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে এই প্রকল্প নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে। এর ফলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং ইউজিসি কিছুটা চাপে পড়ে।

তবে গত ১ এপ্রিল ইউজিসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করে যে, প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং বিশ্বব্যাংক একে মাঝারিমানের সন্তোষজনক বলে মূল্যায়ন করেছে। ইউজিসির এই দাবি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হিট প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এখন পর্যন্ত রিসার্চ ফান্ডের জন্য মাত্র ১১৬ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। আগের ডিপিপি অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে যা তারা সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, এই প্রকল্পে মেধাবী ও স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নির্বাচন করা হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার বদলে ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে গবেষণার প্রস্তাব মূল্যায়ন করানো হয়েছে। এসব গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও গত বছরের আগস্ট মাসে নির্বাচিত ১৫১টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়নে ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করে ইউজিসি এবং ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ ছাড় করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রিভিউয়ারদের ম্যানেজ করে প্রকল্পগুলোর জন্য সর্বোচ্চ নম্বর প্রদানের বিনিময়ে অর্থের অর্ধেক ভাগ নেওয়ার মৌখিক চুক্তি করেছে। এভাবে শতাধিক প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজেও এই সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর মামুন আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রকল্প মূল্যায়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে হিট প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগ নিয়ে নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রথম স্থান অধিকারী প্রার্থীকে রাজনৈতিক কারণে বাদ দিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই প্রথম পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্পে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হিট প্রকল্পের বর্তমান পিডি অধ্যাপক আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, তারা এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করেছেন এবং আগের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এস এম/ ১১ এপ্রিল ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language