এশিয়া

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ভয়াবহ হামলা

জেরুজালেম, ২৩ মার্চ – অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। তারা একের পর এক ঘরবাড়ি, যানবাহন ও ফসলি জমিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। শনিবার আঠারো বছর বয়সী ইহুদি তরুণ ইহুদা শেরম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। জানা গেছে কোয়াড বাইক চালানোর সময় এক ফিলিস্তিনির গাড়ির ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে এই ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাকি নিছক দুর্ঘটনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে বদলা নিতে প্রতিশোধ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে রাতারাতি বিশটিরও বেশি হামলার খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আক্রমণের পর থেকে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পহেলা মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস বা আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে শনিবার রাতে বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রামে তাদের সেনা ও সীমান্ত পুলিশ ইউনিট পাঠানো হয়েছে। ফিলিস্তিনে তাদের অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলের বেসামরিক নাগরিকরা ঘরবাড়ি ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এমন খবর পাওয়ার পর তারা এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হামলার শিকার গ্রামগুলোর মধ্যে জালুদ, কারিয়ুত, আল-ফান্দুকুমিয়াহ এবং সিলাত আদ-দাহর উল্লেখযোগ্য।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে কালো পোশাক পরা এবং মাস্ক লাগানো নব্বই জনেরও বেশি লোক জালুদ গ্রামে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালাচ্ছে। অন্য একটি ভিডিওতে গ্রামটির একাধিক যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ভবনের জানালা ভাঙা অবস্থায় ছিল এবং অ্যাম্বুলেন্স আসার সময় সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এছাড়া একটি ভবনের গায়ে স্প্রে পেইন্ট দিয়ে ইহুদার বদলা নাও কথাটি লেখা ছিল।

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে জালুদে হামলাকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বেশ কিছু হামলাকারীও আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে বসতি স্থাপনকারীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লেখা হয়েছে ইহুদিদের রক্ত ঝরলে তারা চুপ থাকবে না। অন্য একটি বার্তায় প্রতিশোধ গ্রহণ এবং শত্রুদের নির্মূল করার কথা বলা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে ঈদুল ফিতরের মধ্যে চালানো এই হামলায় ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হত্যা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও সংযোগস্থলগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসরায়েলি পুলিশ রবিবার জানিয়েছে দেইর আল-হাতাব গ্রামের কাছ থেকে সীমান্ত রক্ষীরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা আরও জানায় ইতামার বসতির কাছে বেশ কিছু ইসরায়েলি বেসামরিক বাসিন্দা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালালে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে তারা উগ্রপন্থী সহিংস ব্যক্তিদের প্রতি বিন্দুমাত্র নমনীয় হবে না।

ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিন এই হামলাগুলোকে এক রাতের তাণ্ডব বা পোগ্রোম হিসেবে বর্ণনা করেছে। রবিবার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায় হামলার পরিকল্পনার কথা আগে থেকে জানা থাকা সত্ত্বেও বাহিনীগুলো আবারও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই তাণ্ডব ঠেকাতে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী রবিবার বিকেলে ইহুদা শেরম্যানের জানাজায় পাঁচশর বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন। রবিবার সন্ধ্যায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করে রাখে।

অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো আবারও ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর বাইরে জড়ো হতে শুরু করেছে। স্থানীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে তারা নাবলুসের উত্তর পশ্চিমে একটি গাড়ি ধোয়ার জায়গায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য দাবি করেছিল যে আঠাশে ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাত্রা যে হারে বেড়েছে তা ইসরায়েলকে অবশ্যই থামাতে হবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে সাত জন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আঠারো জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পনেরোটি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। ইসরায়েলের মধ্য বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটস এর নেতা ইয়ার গোলান এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইসরায়েল সরকারকে এর সুযোগ দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যখন তারা ইরান এবং উত্তর সীমান্তে যুদ্ধ করছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে তখন সরকার সম্পূর্ণ নৈরাজ্যকে উৎসাহিত করছে। তিনি আরও যোগ করেন যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইহুদি সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি চরম ব্যর্থতা।

গত সপ্তাহে অন্য একটি হামলার পর আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেছিলেন পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতা নৈতিক ও নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় একশো ষাটটি বসতি তৈরি করেছে যেখানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করে। ফিলিস্তিনিরা গাজা সহ এই ভূখণ্ডকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখতে চায়। বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় তেত্রিশ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ।

এস এম/ ২৩ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language