ঝালকাঠিতে ভুয়া কার্ডে পুলিশের প্রায় ৪ কোটি টাকার রেশন আত্মসাৎ, ১১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ঝালকাঠি, ১২ মার্চ – ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে ভুয়া কার্ড ব্যবহার করে প্রায় চার কোটি টাকার রেশন সামগ্রী আত্মসাতের ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছরে ২৫২টি ভুয়া কার্ডের মাধ্যমে এই জালিয়াতি করা হয়।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার ১১ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামিদের তালিকায় রয়েছেন ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের সাবেক মেস ম্যানেজার সহকারী উপপরিদর্শক মো. আলাউদ্দিন, পুলিশ পরিদর্শক আরিফ মাহামুদ, মো. আল মামুন, মো. রেজাউল করিম ও কাজী রাজীউজ জামান।
এছাড়া কনস্টেবল আতিকুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, অফিস সহকারী তৌফিক এলাহী, রেশন স্টোরের ওজনদার জহির উদ্দিন এবং বিক্রয় সহকারী সৈয়দ জসিম উদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, সব মিলিয়ে তিন কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৮৫ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রেশন স্টোরের হিসাবপত্রে এমন অনেক কার্ড নম্বর পাওয়া গেছে বাস্তবে যেগুলোর বিপরীতে কোনো পুলিশ সদস্যের অস্তিত্ব নেই।
বছরের পর বছর এসব ভুয়া কার্ড ব্যবহার করে চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন রেশন সামগ্রী উত্তোলন করা হতো। পরে সেগুলো বাজারে বিক্রি করে বা অন্য উপায়ে নগদে রূপান্তর করা হতো। জালিয়াতির এই চক্রটি একদিনে তৈরি হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্নীতির পরিধি ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের শুরুতে ৬০টি ভুয়া কার্ড তৈরি করে প্রায় ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকার রেশন উত্তোলন করা হয়। ২০১৪ সালে ৫৬টি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ২৯ লাখ টাকার রেশন তোলা হয়। ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও একই ধারা অব্যাহত থাকে। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আত্মসাতের পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে। ২০২০ ও ২০২১ সালে এই জালিয়াতি চরম আকার ধারণ করে।
শুধু ২০২০ সালেই ১৪৮টি ভুয়া কার্ডে প্রায় ৭৩ লাখ টাকার রেশন এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৫২টি কার্ড ব্যবহার করে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকার রেশন আত্মসাৎ করা হয়। এই বিশাল জালিয়াতির ঘটনায় তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে নিয়মিত কার্ড যাচাই এবং হিসাব মেলানোর কথা থাকলেও এত বছর ধরে কীভাবে ভুয়া কার্ডে রেশন তোলা হলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, অভিযুক্তরা হিসাবের খাতায় সবকিছু ঠিকঠাক দেখানোর চেষ্টা করেছে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কাগজের হিসাব মিলিয়ে দেখার পরই গরমিল ধরা পড়ে। অন্যদিকে ঝালকাঠির সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, রেশন ব্যবস্থা মূলত পুলিশ সদস্যদের সহায়তার জন্য চালু করা হয়েছে। সেখানে এমন জালিয়াতি শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ আস্থার জায়গাতেও একটি বড় আঘাত।
এ এম/ ১২ মার্চ ২০২৬








