খামেনিসহ শীর্ষ ইরানি নেতাদের মৃত্যু এবং মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাস

ওয়াশিংটন, ৪ মার্চ – যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা গত শনিবার নিহত হয়েছেন। এই ঘটনা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। তবে এই উত্তেজনার পেছনের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ পুরোনো। গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং সামরিক বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করে আসছে।
এর মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন থেকে শুরু করে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি ধারাবাহিক রূপ। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয় মূলত ১৯৫০ এর দশকে, যার কেন্দ্রে ছিল তেল ও বাণিজ্য। ওই সময়ে নিজেদের তেলের সরবরাহ এবং কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বিশেষ অংশীদারত্ব গড়ে তোলে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাদের তেল চুক্তির বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়।
১৯৫১ সালে ইরানের তৎকালীন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে পার্লামেন্ট শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতা সীমিত করে দেশের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। মোসাদ্দেক তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন এবং রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও ঘনীভূত করে। এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ওয়াশিংটনকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ারের প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ইরানে একটি অভ্যুত্থান ঘটাতে সহায়তা করে।
তারা বিক্ষোভে অর্থায়ন করে এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। একই বছরের আগস্ট মাসে রাজতন্ত্রপন্থী কর্মকর্তারা মোসাদ্দেকের বাসভবন ঘেরাও করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন এবং শাহর ক্ষমতা সুসংহত করেন। এরপর ওয়াশিংটন ইরানকে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন তেল কনসোর্টিয়াম গঠনের দিকে নিয়ে যায়, যাতে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোও লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি সিআইএ শাহর নতুন নিরাপত্তা সংস্থা সাবাক প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে এবং এর সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। পরবর্তীতে এই বাহিনী ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন এবং নির্যাতনের জন্য অত্যন্ত কুখ্যাত হয়ে ওঠে। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানে একটি শক্তিশালী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রিমাকভ ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর প্রধান গবেষক নিকোলাই সুকহভ জানান, ইরানের এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল কৌশলগত সম্পদ এবং জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। অবশেষে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের চূড়ান্ত পতন ঘটে। এই বিপ্লবের পেছনেও ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ক্ষোভ। শাহর পতনের পর বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে প্রবেশ করে সেটিকে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হিসেবে আখ্যা দেয় এবং মার্কিন কূটনীতিকদের ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয় এবং যে বৈরিতার সূচনা হয়, তা আজও চলমান।
এসএএস/ ৪ মার্চ ২০২৬









