সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাজ্যের নতুন আশ্রয়নীতি ও বাংলাদেশিদের কঠিন ভবিষ্যৎ

নজরুল মিন্টো

n

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২ মার্চ সোমবার দেশটির স্বরাষ্ট্র সচিব শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা কেবল একগুচ্ছ নীতিগত সংশোধন নয়, বরং দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী হাজার হাজার মানুষের ভবিষ্যৎকে নতুন অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়ার বার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা বা আসার অপেক্ষায় থাকা কয়েক হাজার মানুষের জন্য এই ঘোষণা এক চরম অনিশ্চয়তার সংবাদ। সরকারের নতুন ‘কোর প্রোটেকশন’ (Core Protection) মডেল অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাজ্যে শরণার্থী হওয়া মানেই আর স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা নয়।

শাবানা মাহমুদের এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলা। বছরের পর বছর ধরে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা ক্ষুদ্র নৌকার মিছিল এবং অভিবাসন নিয়ে ব্রিটিশ জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ মেটাতে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার একে বলছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফেয়ার’ পদ্ধতি। ডেনমার্কের কঠোর আশ্রয়নীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নতুন সংস্কার আনা হয়েছে। ডেনমার্কে এই পদ্ধতি চালুর পর সেখানে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। যুক্তরাজ্যও চায় তাদের দেশে আসার ‘আকর্ষণ’ (Pull Factor) কমিয়ে দিতে, যাতে মানুষ অবৈধ পথে আসার ঝুঁকি না নেয়।

এই সংস্কারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো “অস্থায়ী সুরক্ষা” এবং “৩০ মাসের রিভিউ”। এখন থেকে যারা আশ্রয় আবেদন করবেন এবং শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন, তারা শুরুতে ৩০ মাস বা আড়াই বছরের জন্য থাকার অনুমতি পাবেন। আগে এই সময়সীমা ছিল সাধারণত ৫ বছর।

৩০ মাস শেষ হওয়ার আগেই মামলা বাধ্যতামূলকভাবে পুনর্মূল্যায়ন হবে। ব্রিটিশ হোম অফিস (Home Office) পরীক্ষা করে দেখবে যে, ওই ব্যক্তির নিজ দেশের (যেমন বাংলাদেশ) পরিস্থিতি এখন কেমন। যদি দেখা যায় যে সেখানে আর কোনো সরাসরি বিপদ নেই, তবে তার সুরক্ষা বাতিল করে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অর্থাৎ শরণার্থী মর্যাদা এখন একবার পাওয়া মানে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়, বরং পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার মুখোমুখি থাকা।

আগে ৫ বছর শরণার্থী হিসেবে থাকার পর ‘ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (ILR) বা স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা যেত। কিন্তু ‘কোর প্রোটেকশন’ মডেলে সেটেলমেন্টের জন্য অপেক্ষা লাগতে পারে ২০ বছর পর্যন্ত, যদি না কেউ কাজ বা পড়াশোনার মতো বৈধ ভিসা রুটে নিজেকে স্থানান্তর করতে পারেন। এই দীর্ঘ অপেক্ষা মানে একটি প্রজন্মের বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটতে পারে।

যুক্তরাজ্যে বর্তমানে কয়েক হাজার বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয় বা মানবিক আশ্রয়ের আবেদন করে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বেড়েছে বলে রিপোর্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন ছিল ৭,২২৫, যা আগের বছরের তুলনায় বড় বৃদ্ধি। নতুন এই নীতি তাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কমিউনিটির মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

যুক্তরাজ্য সরকার নিয়মিতভাবে ‘নিরাপদ দেশের তালিকা’ আপডেট করছে। বাংলাদেশকে যদি কোনও পর্যায়ে তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

কোনো বাংলাদেশি যদি বিশেষ বিবেচনায় ৩০ মাসের সুরক্ষা পানও, তার মাথায় সারাক্ষণ আশঙ্কা থাকবে, আড়াই বছর পর তাকে ফেরত যেতে হতে পারে। যারা জমিজমা বিক্রি করে বা দালালের মাধ্যমে বিপুল অর্থ খরচ করে এসেছেন, তাদের জন্য এই অনিশ্চয়তা গভীর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেন। কিন্তু নতুন নিয়মে কোনো গ্যারান্টি নেই যে তারা স্থায়ীভাবে থাকতে পারবেন। ফলে এই বিশাল বিনিয়োগ এখন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ

মানবিক দিক বিবেচনায় অভিভাবকহীন শিশুদের (Unaccompanied Minors) এই ৩০ মাসের কঠোর নিয়ম থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। তারা আগের মতোই ৫ বছরের সুরক্ষা পাবে। তবে সরকার বয়স নির্ধারণকে আরও কড়াকড়ি করতে চাইছে। অনেকেই বয়স কমিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা রোধ করতে সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত প্রযুক্তির সাহায্য নেবে। মিথ্যা তথ্য প্রমাণিত হলে সরাসরি বিতাড়নের মুখোমুখি হতে হবে।

বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো পারিবারিক পুনর্মিলন স্থগিত করা। আগে একজন শরণার্থী তার স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু এখন সরকার এই প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রেখেছে। নতুন যে নিয়ম আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তাতে একজন শরণার্থীকে তার পরিবার আনতে হলে ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো উচ্চ আয়ের (Income Threshold) প্রমাণ দিতে হবে। সেই সক্ষমতা অর্জন সম্ভব না হলে স্ত্রী ও সন্তানকে যুক্তরাজ্যে আনা বহু পরিবারে শুধু স্বপ্নই থেকে যেতে পারে

সরকার বলছে, শরণার্থীদের কেবল সাপোর্ট সিস্টেমে আটকে না রেখে কাজ কিংবা পড়াশোনার বৈধ পথে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করা হবে। দক্ষ পেশায় (Skilled Work) কাজ পেলে কেউ ওয়ার্ক ভিসা বা স্টাডি ভিসার মতো রুটে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু এই পথের বড় বাধা ভিসা ফি এবং হেলথ সারচার্জ। সাধারণ অভিবাসীদের মতো কয়েক হাজার পাউন্ড জোগাড় করা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেমন ‘রিফিউজি কাউন্সিল’ এবং ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ এই সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, ১৯৫১ সালের আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন অনুযায়ী শরণার্থীদের স্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ৩০ মাস পর পর দেশ ছাড়ার আশঙ্কায় থাকা একজন মানুষ কখনোই ব্রিটিশ সমাজে মিশে যেতে পারবেন না, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ প্রবণতা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, এই কঠোরতা না দেখালে অনিয়মিত যাত্রা থামবে না এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে জনআস্থা ফিরবে না। তবে এই অবস্থান লেবার পার্টির ভেতরেও চাপ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং স্বরাষ্ট্র সচিব শাবানা মাহমুদের এই পদক্ষেপে দলের বামপন্থী অংশের কিছু এমপি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, এবং কেউ কেউ একে কনজারভেটিভদের চেয়েও বেশি কঠোর বলে মন্তব্য করেছেন। তবু সরকার অনড়। তারা আগামী নির্বাচনের আগে দেখাতে চায় যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে তারা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে।

তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই নতুন নিয়ম আগের আবেদনকারীদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে না। সংসদীয় বক্তব্যে বলা হয়েছে, ২ মার্চের আগে যারা আবেদন করেছেন, তাদের জন্য ট্রানজিশনাল প্রভিশন থাকবে, অর্থাৎ পুরনো নিয়মেই প্রক্রিয়া চলবে। ফলে বাংলাদেশিদের একটি অংশ তাৎক্ষণিক ধাক্কা থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন, কিন্তু নতুন আবেদনকারীদের জন্য দরজা এখন অনেক বেশি কঠিন।

যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থার এই ‘মহাসংস্কার’ কেবল নিয়মের তালিকা নয়, এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে যুক্তরাজ্যের দরজা এখন সংকীর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যারা রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার আশায় আসছেন, তাদের জন্য আগামী দিনগুলো হবে আরও কণ্টকাকীর্ণ। এখন আর কেবল আশ্রয়ের আবেদন করলেই স্থায়ী বসবাস বা ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার স্বপ্ন দেখা যাবে না। ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, প্রতি আড়াই বছর পর পর পর্যালোচনা, এবং পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পথ কঠিন হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোতে হবে। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, ‘নিরাপদ আশ্রয়ের’ বদলে ‘সাময়িক আশ্রয়ের’ এই ধারণা ধীরে ধীরে ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করতে পারে

তথ্যসূত্র:
UK Parliament, Written Statement HCWS1373 (২ মার্চ ২০২৬)
The Guardian (১ মার্চ ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language